- ধূমপানে বাঁধা দেওয়ায় গুলি, ৬জন হাসপাতালে
- রাজপথে একজন ধূমপান করে পেছনে ১০ জনের নাকে ধোয়া যাচ্ছে
- প্রতিবাদ করলে হুমকি, প্রাইভেটকারে চলাচলের পরামর্শ
- খুলনায় তামাক বর্জন ও প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধের দাবিতে কর্মশালা: প্রফেসর আকরাম
রাজধানীর ব্যস্ততম পুরানা পল্টন মোড়। অফিস ছুটির পর মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ঠিক এই জনসমুদ্রের মাঝেই হেঁটে হেঁটে সিগারেট টানছেন এক যুবক। তার ঠোঁট থেকে নির্গত হওয়া ঘন ধূসর ধোঁয়া পেছনের বাতাসে মিশে যাচ্ছে। আর সেই বিষাক্ত ধোঁয়া বাধ্য হয়েই বুকে টেনে নিচ্ছেন পেছনে থাকা ১০ জনেরও বেশি সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছে স্কুলফেরত শিশু ও গর্ভবতী নারী। কেউ একজন মৃদুস্বরে একটু প্রতিবাদ করতেই উল্টো ক্ষেপে উঠলেন সেই ধূমপায়ী। চোখ রাঙিয়ে কর্কশ গলায় বললেন, “ধোঁয়া সহ্য না হলে প্রাইভেটকারে চড়েন, না হয় ইউরোপের দেশে গিয়ে বসবাস করেন!”
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজধানীর তোপখানা রোড, বিজয়নগর কিংবা নবনির্মিত সচিবালয় মেট্রো স্টেশনের নিচে প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য এটি। মেট্রো থেকে নেমে ফাঁকা জায়গায় এসেই একশ্রেণীর মানুষ হেঁটে হেঁটে সিগারেট টানতে শুরু করেন, যা পেছনের শত শত যাত্রীর জন্য দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। কিন্তু এই অবিনয়ী আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মানুষকে কেবল নাজেহালই হতে হচ্ছে না, কোথাও কোথাও ঝরছে রক্ত, বুক ঝাঁঝরা হচ্ছে বুলেটে।
বড়দের সামনে ধূমপানের প্রতিবাদ: নোয়াখালীতে চলল এলোপাতাড়ি গুলি
রাজধানীর বুকে যা কেবলই মৌখিক হাহাকার আর ধমক, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে তা রূপ নিয়েছে এক রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডিতে। বয়স্কদের সামনে প্রকাশ্যে ধূমপান করার প্রতিবাদ করায় সেখানে ঝরেছে রক্ত। উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের চৌরাস্তা মোড়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে কয়েকজন চিহ্নিত যুবক প্রকাশ্যে ধূমপান করছিল।
সামাজিক মর্যাদা ও বয়স্কদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের খাতিরে স্থানীয় কয়েকজন তাদের সেখানে ধূমপান করতে নিষেধ করেন। কিন্তু এই সামান্য অনুরোধে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত না হয়ে উল্টো চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে তারা। স্থানীয়দের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
এরই জের ধরে পরদিন শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ৫ থেকে ৬টি মোটরসাইকেল যোগে ৮ থেকে ১০ জন যুবক আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে নোয়াগাঁও চৌরাস্তার মোড়ে হানা দেয়। তারা মোটরসাইকেল থেকে নেমেই সাধারণ মানুষের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দমুখর মোড়টি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
মানুষ জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়াতে থাকে। ঘটনাস্থলেই ৬ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হামলাকারীরা গুলি করতে করতে পালিয়ে যাওয়ার পর পুরো এলাকায় এক থমথমে ও আতঙ্কিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি, হামলায় কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সন্দেহের তীর স্থানীয় ‘হেলমেট বাহিনী’র দিকে।
এই নৃশংস ঘটনা প্রসঙ্গে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “গুলিবিদ্ধ ৬ জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ৪ জনকে নোয়াখালী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।” পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার পর পরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গুলির খোসা উদ্ধার করেছে। সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মুঠোফোনে বলেন, “ঘটনায় মামলা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে। আসামিদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ধূমপান ছাড়াও অন্য কোনো কারণ আছে কিনা, সব কিছু তদন্ত করে দেখা হবে।”
ধূমপানের নির্দিষ্ট স্থান চান পথচারীরা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন নীরব মহামারি
জনসমাগমস্থলে এমন বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার পরও অজ্ঞাত কারণে হেঁটে হেঁটে ধূমপান বন্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ক্ষুব্ধ পথচারীদের মতে, তামাকের এই আগ্রাসন রুখতে রাজধানীসহ প্রতিটি সিটি কর্পোরেশনে ধূমপানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বা ‘ডেজিগনেটেড স্মোকিং জোন’ তৈরি করে দেওয়া উচিত। এতে ধূমপায়ীরা অন্যদের ক্ষতি না করে নিজেদের নেশা মেটাতে পারবে।
চিকিৎসকদের মতে, পরোক্ষ ধূমপান আরও বেশি মারাত্মক। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সিনিয়র শিক্ষক ও ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন তামাকের এই ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “তামাকজনিত রোগ একটি নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে অকাল মৃত্যুবরণ করেন। ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ অসংখ্য রোগের অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। লাখ লাখ পরিবার চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অকাল মৃত্যুর কারণে আর্থিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি।”
তিনি আরও যোগ করেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকের কারণে দেশের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা তামাক থেকে অর্জিত সরকারি রাজস্বের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
তামাকমুক্ত বাংলাদেশের অঙ্গীকার ও দীর্ঘ পথচলা
তামাক নিয়ন্ত্রণে দেশে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫’ প্রণীত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আরও সংশোধন ও বিধিমালা দ্বারা শক্তিশালী করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণ তামাকমুক্ত করার একটি জাতীয় অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) তামাক বর্জন এবং এই সেবাগুলোকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় টেকসইভাবে যুক্ত করার লক্ষ্যে একটি জাতীয় কর্মশালার আয়োজন করে। খুলনার রূপসা স্ট্যান্ড রোডের সিএসএস আভা সেন্টারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন।
খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জনসহ চিকিৎসা খাতের নীতি-নির্ধারকদের উপস্থিতিতে বক্তারা বলেন, শিশু-কিশোরদের তামাকাসক্তি প্রতিরোধে এখন থেকেই স্কুল-কলেজ ভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। একই সাথে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
নোয়াখালীর বুলেটের ক্ষত আর রাজধানীর রাজপথের বিষাক্ত ধোঁয়া; উভয়ই মনে করিয়ে দেয়, তামাক শুধু স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে না, তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও নিরাপত্তাকেও আজ হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে
This post was created with our nice and easy submission form. Create your post!


GIPHY App Key not set. Please check settings