বিগত কয়েক বছর রাজপথ ছিল যাদের সংসার, আদালত-জেলজুলুম যাদের দমাতে পারেনিÑ তাদের মধ্যে অনেকেই দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এখন সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, রাজপথ থেকে সংসার, সংসার থেকে পেশা সবকিছুতেই নারীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এবার সংসদে যাচ্ছেন দীর্ঘদিনের পরিশ্রমী নেত্রীরা, অভিজ্ঞ ও তরুণ নারী নেত্রীরা, পেশাজীবী ও শিক্ষিত নারীরা। সংসদে যাচ্ছেন বিএনপির ৩৬, জামায়াতের ১২ বা ১৩, স্বতন্ত্র ১ জন প্রার্থী। সংরক্ষিত নারী আসন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে- শিক্ষা, আয় ও সম্পদের দিক থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে এই দলটির বেশির ভাগ প্রার্থীই রাজনীতিতে অভিজ্ঞ এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যাও বেশি। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা তুলনামূলক কম সম্পদশালী, মামলাহীন এবং অধিকাংশই প্রথমবারের মতো সংসদে আসতে চাচ্ছেন।
ইসির হলফনামা অনুযায়ী, সংসদের সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মধ্যে বিএনপি জোটের ৩৬ জন, জামায়াত জোটের ১২ জন এবং স্বতন্ত্র একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। বিএনপি জোটের ৩৬ প্রার্থীর মধ্যে ১৬ জনই কোটিপতি, যেখানে জামায়াত জোটে ১২ জনের মধ্যে কোটিপতি মাত্র একজন। কোনো আসনে একাধিক প্রার্থী না থাকায় আগামী ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষে এসব প্রার্থী কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীদের হলফনামায় এই বৈসাদৃশ্য দুই ধরনের রাজনৈতিক কৌশলেরই প্রতিফলন।
হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সম্পদ ও আয়ের ক্ষেত্রে বিএনপি জোটের প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। ৩৬ জনের মধ্যে ১৬ জন কোটিপতি, যা মোট প্রার্থীর প্রায় ৪৪ শতাংশ। অনেকের সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও কারও কারও সম্পদ ১০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে। নিপুণ রায় চৌধুরীর বিপুল স্বর্ণালঙ্কার ও সম্পদের পরিমাণ যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি সেলিমা রহমান, হেলেন জেরিন খান, শিরীন সুলতানা ও সুলতানা আহমেদের মতো প্রার্থীদের কয়েক কোটি টাকার সম্পদও নজর কাড়ে। এদের আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবসা, জমি বিক্রি, বিনিয়োগ, বাড়িভাড়া ও পেশাগত আয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াত জোটের প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতি মাত্র একজন, তিনি হলেন সাবিকুন্নাহার। এ ছাড়া অধিকাংশ প্রার্থীর সম্পদ ২০ থেকে ৮০ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং বার্ষিক আয়ও তুলনামূলকভাবে কম। এদিকে শিক্ষার ক্ষেত্রে দুই জোটেই উচ্চশিক্ষার স্পষ্ট উপস্থিতি রয়েছে। বিএনপি জোটে এমএ, এমএসএস, এলএলবি, এমবিবিএস, বার-অ্যাট-ল’সহ বিভিন্ন উচ্চতর ডিগ্রিধারী প্রার্থীর আধিক্য দেখা যায়। এমনকি বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়া প্রার্থীও রয়েছেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে স্বল্পশিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত প্রার্থীও বিএনপি জোটে মনোনয়ন পেয়েছেন। জামায়াত জোটেও স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের আধিক্য রয়েছে। শিক্ষক, চিকিৎসক ও আইনজীবী পেশার প্রতিনিধিত্ব সেখানে উল্লেখযোগ্য। ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে কোনো জোটই পিছিয়ে নেই।
দুই জোটের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় মামলার ক্ষেত্রে। বিএনপি জোটের অধিকাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ছিল বা রয়েছে। যদিও অনেকেই খালাস পেয়েছেন বা মামলা প্রত্যাহার হয়েছে, তবুও সংখ্যার দিক থেকে এটি উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে জামায়াত জোটের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রায় নেই বললেই চলে। এ বিষয়টি তাদের প্রোফাইলকে তুলনামূলকভাবে ‘পরিচ্ছন্ন’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
বিএনপি জোটে বয়সের পরিসর ৩২ থেকে ৮৫ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রবীণ রাজনীতিক সেলিমা রহমান যেমন রয়েছেন, তেমনি তরুণ চিকিৎসক বা আইনজীবী প্রার্থীরাও আছেন। অনেকেরই পূর্বে সংসদ সদস্য বা সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। জামায়াত জোটের প্রার্থীদের বয়স ৩৭ থেকে ৬৮ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং তাদের সবাই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। ফলে অভিজ্ঞতার তুলনায় নতুন মুখের আধিক্য সেখানে বেশি।
বিএনপি জোটে আইনজীবী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, লেখক ও পেশাজীবীদের সমন্বয় দেখা যায়। অনেকেই রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা বা বিনিয়োগ থেকে উচ্চ আয়ের সঙ্গে যুক্ত। জামায়াত জোটে শিক্ষক, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের উপস্থিতি বেশি। পেশাগত স্থিতিশীলতা থাকলেও আয় ও সম্পদের দিক থেকে তারা পিছিয়ে। বিএনপি প্রার্থীদের সম্পদের মধ্যে নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, শেয়ার, জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পদের প্রভাবও স্পষ্ট। জামায়াত প্রার্থীদের সম্পদ তুলনামূলকভাবে সীমিত কিছু জমি, স্বল্প সঞ্চয়, স্বর্ণালঙ্কার ও সীমিত বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ। অনেকেরই স্থাবর সম্পদ নেই বা খুব কম। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী সুলতানা জেসমিনের সম্পদ ও আয় মাঝামাঝি পর্যায়ের। তার সম্পদ প্রায় ২৮ লাখ টাকা এবং বার্ষিক আয় সাড়ে ৫ লাখ টাকা। তার বিরুদ্ধে কিছু মামলা থাকলেও ইতোমধ্যে সেগুলো প্রত্যাহার হয়েছে।
This post was created with our nice and easy submission form. Create your post!



GIPHY App Key not set. Please check settings