গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের তিন সপ্তাহ পার হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের শাসকগোষ্ঠী এমন এক বার্তা দিচ্ছে যে, তারা বিশ্বাস করে এই যুদ্ধে তারাই জয়ী হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ওয়াশিংটনকে এমন এক শান্তি চুক্তিতে বাধ্য করার শক্তি তারা অর্জন করেছে, যা আগামী কয়েক দশকের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদের ওপর ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই মনোভাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃঢ় সংকল্প কিংবা ইসরায়েলের কৌশলগত আঘাত হানার সক্ষমতাকে ভুলভাবে পাঠের ফল হতে পারে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, এই যুদ্ধ ‘মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত’ শেষ হবে। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে’ সংঘাত গুটিয়ে আনা হবে, যদিও পেন্টাগন ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক হাজার অতিরিক্ত মেরিন সেনা পাঠিয়েছে।
সব মিলিয়ে, তিন সপ্তাহের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তেহরানের ‘বিজয়’ দেখার আকাঙ্ক্ষা এবং ওয়াশিংটনের ‘অপমান’ এড়ানোর জেদ পৃথিবীকে আরও বড় কোনও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
যুদ্ধের নাটাই কি তেহরানের হাতে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ও লঞ্চার ধ্বংসের দাবি করলেও, ইরান এখনও প্রতিদিন ডজন ডজন ব্যালেস্টিক মিসাইল এবং অসংখ্য ড্রোন ছোড়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। গত ১০ দিনের তুলনায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের হামলার গতি আরও বেড়েছে। কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন এবং আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরান বিপর্যয়কর ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছে, অথচ ইরানের নিজস্ব তেল রফতানি এখনও চাঙ্গা।
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক দিনা এসফান্দিয়ারি বলেন, ‘ইরানিরা এখনই যুদ্ধ থামাতে প্রস্তুত নয় কারণ তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে: খুব সহজে এবং কম খরচে তারা বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। তারা এখন চায় পুরো বিশ্বও এই শিক্ষাটি পাক।’
ইরানের আকাশচুম্বী দাবি
তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ওয়াশিংটন এবং উপসাগরীয় দেশগুলো চড়া মূল্য দিলেই কেবল তারা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে। ইরানি পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনও আলোচনা এখন এজেন্ডায় নেই, তেহরান এখন ‘আগ্রাসীদের শাস্তি’ দিতে মনোযোগী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘আরেকটি ভিয়েতনাম’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ এবং এ অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। সবচেয়ে বিতর্কিত দাবিটি হলো হরমুজ প্রণালিকে ইরানের একটি ‘টোল বুথ’-এ রূপান্তর করা। এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রবাহিত অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। সর্বোচ্চ নেতার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের বলেছেন, ‘ইরান প্রতিটি জাহাজ থেকে ফি আদায় করবে। আমরা আধিপত্যকামী দাম্ভিক শক্তিগুলোকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনব।’
ট্রাম্পের পাল্টা হুঁশিয়ারি
ট্রাম্প ও তার মিত্ররা ইরানের এই দাবি মেনে নেবেন এমনটা ভাবা কঠিন। ট্রাম্প বারবার শপথ করেছেন যে, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তিনি হরমুজ প্রণালি খুলে দেবেন। ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করে বলেন, হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করা একটি ‘সাধারণ সামরিক কৌশল’ এবং এতে ‘খুব সামান্য ঝুঁকি’ রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন এয়ার ফোর্স লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডেভিড ডেপটুলা বলেন, ‘এটি রাতারাতি ঘটবে না, তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানিদের হাতে থাকবে না, আমাদের হাতে থাকবে।’
চ্যাথাম হাউসের সানাম ওয়াকিল সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি এখন পিছু হটে এবং ইরানকে এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেয়, তবে তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য একটি চূড়ান্ত ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হবে।’
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ফেলো অ্যালেক্স ভাটানকা বলেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর শুরু থেকেই অবাস্তব কট্টরপন্থা অনুসরণের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮২ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরান তার সব ভূমি উদ্ধার করার পরও কেবল ‘দুর্বল না দেখানোর’ জন্য ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল, যার ফলে লাখো মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
অন্যদিকে প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোল গ্রাজিউস্কি মনে করেন, এই যুদ্ধ ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে অভ্যন্তরীণভাবে আরও শক্তিশালী করতে পারে। জানুয়ারিতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যার পর যে জনরোষ তৈরি হয়েছিল, এই যুদ্ধকে ‘নতুন ইরান-ইরাক যুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার করে সরকার জাতীয়তাবাদী আবেগের মাধ্যমে টিকে থাকার নতুন মিথ তৈরি করতে পারে।
একক শক্তিতে সমাধান হচ্ছে না, হরমুজ নিয়ে সুর বদলালেন ট্রাম্প
ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইরানি তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল যুক্তরাষ্ট্রের
This post was created with our nice and easy submission form. Create your post!



GIPHY App Key not set. Please check settings