লেবাননের কাফর তিবনিত গ্রামে হিজবুল্লাহর পৃথক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ইসরায়েলি ব্যাটালিয়ন প্রধানসহ অন্তত চার সেনা নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন আরো পাঁচ সেনা।
এদিকে, এই হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে এর প্রতিশোধ নেয় ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলের এই পাল্টা হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ‘মধ্যরাতের পর কাফর তিবনিত গ্রামে হিজবুল্লাহর একটি সন্দেহভাজন ড্রোন বা ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৪০১তম আর্মার্ড ব্রিগেডের ৫২তম ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডোর গেদালিয়া বেন সিমহন এবং তার ট্যাংকের অন্য তিন ক্রু সদস্য নিহত হন।’
৩২ বছর বয়সি বেন সিমহন গত এপ্রিল মাসে এই ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, ‘যখন এর আগের কমান্ডার দক্ষিণ লেবাননে গুরুতর আহত হন। এই প্রাণঘাতী হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর একই গ্রামে হিজবুল্লাহর আরেকটি বিস্ফোরক ড্রোন ইসরাইলি কমান্ডো ব্রিগেডের ওপর আঘাত হানে। এতে এক রিজার্ভ অফিসার গুরুতর আহত হওয়াসহ মোট পাঁচ ইসরাইলি সেনা জখম হন।’
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইসরাইলি বিমান বাহিনী লেবাননের নাবাতিয়েহ, বেকা উপত্যকাসহ অন্তত ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে তীব্র বোমাবর্ষণ শুরু করে। আইডিএফের দাবি, হিজবুল্লাহর পুনঃপুন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে তারা এই হামলা চালিয়েছে এবং এতে হিজবুল্লাহর একাধিক কমান্ড সেন্টার ও রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংসসহ বেশ কিছু প্রতিরোধ যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্যরাতের পর থেকে শুরু হওয়া এই ইসরাইলি বিমান হামলার কারণে বহু এলাকায় হতাহতদের উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এই নতুন সহিংসতা চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)-কে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা থাকলেও ইসরাইল এই চুক্তির অংশ ছিল না।
ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের তাদের নিয়ন্ত্রিত বাফার জোন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা ইরান ও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল বলে গণ্য করা হচ্ছে। এই উত্তেজনার জের ধরেই সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে গেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
চুক্তিটি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইসরাইলি কট্টরপন্থী নেতারা এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করছেন। ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে ইসরাইলি সেনাদের রক্তের বিনিময়ে কোনো মার্কিন চুক্তির তোয়াক্কা করা হবে না এবং পুরো লেবাননকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোট ইসরাইলকে মার্কিন-ইরান চুক্তিকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন এবং ওয়াশিংটনকে ইসরাইলের ওপর প্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগ করার অনুরোধ করেছেন।
উল্লেখ্য, গত মার্চ মাসে মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর হিজবুল্লাহ ইসরাইলে নতুন করে রকেট হামলা শুরু করে, যার জবাবে ইসরাইল লেবাননে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালায়। জাতিসংঘ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লেবাননে এ পর্যন্ত ৩,৮০০-র বেশি মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, অন্যদিকে ইসরাইলের পক্ষে ৩৫ জন সেনা নিহত হয়েছেন। ওপরে ওপরে মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চললেও মাঠপর্যায়ের এই ভয়াবহ সহিংসতা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়াকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল
This post was created with our nice and easy submission form. Create your post!



GIPHY App Key not set. Please check settings