তদারকির অভাবে ঈদের পর থেকেই অস্থির হয়ে উঠছে ভোজ্যতেলের বাজার। সরকারকে চাপে ফেলে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম আরেক দফা বাড়াতে নতুন করে কারসাজি শুরু করেছে ৫ থেকে ৬টি কোম্পানির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
রমজান মাসের শুরু থেকেই ওই চক্রটি পরিকল্পিতভাবে ডিলারদের মাধ্যমে খুচরা বাজারে তেলের সরবরাহ কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এতে রোজা শেষ হয়ে ঈদের পর এক প্রকার বাজার শূন্য হয়ে যাচ্ছে বোতলজাত সয়াবিন। পরিস্থিতি এমন-মুদি দোকান থেকে দিনে ২০ কার্টনের চাহিদা দিলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৪ কার্টন। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদা বাড়ায় সুযোগ বুঝে খোলা সয়াবিনের দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারে ৩০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বিপাকে পড়ছেন সব শ্রেণির ক্রেতা।
এদিকে গত বছরের ১০ নভেম্বর সয়াবিন তেল লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২৪ নভেম্বর তারা আবারও মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দুবার অনুমতি চাওয়া হলেও ওই সময় মন্ত্রণালয় সাড়া দেয়নি।
একপর্যায়ে ওই সময় ব্যবসায়ী সংগঠন অন্তর্বর্তী সরকারকে পাত্তা না দিয়ে অনুমতি ছাড়াই প্রতি লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। মোড়কে নতুন দাম উল্লেখ করে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ করে। তখন ক্রেতাকে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই তেল কিনতে হয়।
তখন সরকারকে না জানিয়ে নভেম্বরে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তখন ব্যবসায়ীদের শোকজও করা হয়। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর লিটারে ৬ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ তখন সরকারকে পাশ কাটিয়ে নিজেরা লিটারপ্রতি ৯ টাকা বাড়িয়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ বাজার থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে ৯ টাকা থেকে ৩ টাকা কমিয়ে ৬ টাকা বাড়তি আদায় করার সুযোগ পেয়ে যান ব্যবসায়ীরা।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা। রাজধানীর মালিবাগ কাঁচাবাজারে ৬টি বড় মুদি দোকান ঘুরে ৬টিতেই এক ও দুই লিটারের বোতল সয়াবিন তেল পাওয়া যায়নি। তবে ৫ লিটারের কয়েকটি তেল বিক্রি করতে দেখা গেছে। বিক্রিও হয়েছে সরকার নির্ধারিত ৯৫৫ টাকা দরে। এক ও দুই লিটারের তেল না পেয়ে অনেকেই খোলা সয়াবিনের দিকে ঝুঁকেছেন। আর এই সুযোগে সেই খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০৫-২০৬ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। যা সর্বশেষ সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৭৬ টাকা। সেক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে খোলা সয়াবিন তেল খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
মালিবাগ কাঁচাবাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. আল আমিন যুগান্তরকে বলেন, রোজার শুরু থেকেই কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ২০ কার্টন চাহিদা দিলে ২-৩ কার্টন দিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলো ডিলারদের মাধ্যমে এমন কারসাজি করছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফেলেছে। টার্গেট ছিল ঈদের আগেই দাম আরেক দফা বাড়ানোর। কিন্তু নতুন সরকারের কঠোর তদারকিতে তা পারেনি।
তাই ঈদের পর আবার দাম বাড়াতে পাঁয়তারা শুরু করেছে ৫ থেকে ৬টি কোম্পানির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। মুদি ব্যবসায়ী আল আমিন আরও বলেন, কোম্পানিগুলো সরবরাহ একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি আর দু-একদিন চলতে থাকলে বাজার থেকে বোতল তেল পুরোপুরি উধাও হয়ে যাবে। তখন তদারকি সংস্থা খুচরা পর্যায়ে তদারকি করবে। তেল না পেয়ে আমাদের জরিমানা করবে। কিন্তু যারা সব সময় কারসাজি করে, তাদের রাখবে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
একই দিন ১২টা ৪৫ মিনিটে বাড্ডা এলাকার গুদারাঘাট বাজারের ৫টি দোকানের ৪টিতে বোতল সয়াবিন তেলের সংকট দেখা গেছে। এক ও দুই লিটারের গুটিকয়েক বোতল থাকলেও ৫ লিটারের সয়াবিনের বোতল নেই। ক্রেতারা যে দোকানে তেল পাচ্ছেন কিনে নিচ্ছেন।
এদিন নয়াবাজারের ৪টি মুদি দোকান ঘুরে তেলের সংকট দেখা গেছে। বাজারের মুদি বিক্রেতা তুহিন বলেন, ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের গায়ের দাম (এমআরপি) ৯৫৫ টাকা। ডিলারের কাছ থেকে আগে এই তেল ৯৩০ টাকায় কিনতাম, বিক্রি করতাম ৯৪০ টাকায়। ১০ টাকা লাভ থাকত। কিন্তু রোজার মধ্যে ৫ লিটারের বোতল কিনতে হয়েছে ৯৫০ টাকায়, বিক্রি করতে হয়েছে ৯৫৫ টাকায়। ডিলার পর্যায় থেকে তারা ১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আমাদের খুচরা পর্যায়ে ৫ টাকা লাভ কমেছে।
কাওরান বাজারের তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এটিএন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, রোজায় তীরের তেলের বেশ সংকট ছিল। স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে আড়াইশ কার্টন তেল পেতাম। সেখানে তখন কোম্পানি মাত্র ৫০ কার্টন তেল দিত। তাই তখন খুচরায় তেল সরবরাহ কমিয়ে দিতে হয়েছিল। তবে ঈদের আগে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছিল। এখন আবার সরবরাহ কিছুটা কম। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, পরিবহণ সংকটে ভোজ্যতেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
পণ্যবাহী ট্রাক চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছে না। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন স্থানে তেল পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি জানান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি পাম অয়েল আমদানি করে বাংলাদেশ। কিন্তু সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া পাম অয়েল রপ্তানিতে শুল্ক বসিয়েছে। তারা ভোজ্যতেলের চেয়ে বর্তমানে ডিজেল উৎপাদনে বেশি মনোযোগী। মাসখানেক আগে থেকেই বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এসব কারণে বাজারে সরবরাহ কিছুটা কম।
জানতে চাইলে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীরা সব সময় সুযোগ খোঁজে। রোজার শুরুতেই বোতল সয়াবিনের সরবরাহ কমাতে শুরু করেছে সেই ৫-৬টি কোম্পানি। কারণ তারা সরকারকে চাপে ফেলে আরেক দফা দাম বাড়াতে চায়। সরকারের সংস্থাগুলোর তদারকির অভাবেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ‘ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি’ পর্যালোচনা বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বর্তমানে বাজারে ১ লাখ ৭০ হাজার টন তেল মজুত আছে। আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাইপলাইনে রয়েছে। অযথা আতঙ্কিত হয়ে বেশি পণ্য না কেনার জন্য তিনি ভোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
This post was created with our nice and easy submission form. Create your post!



GIPHY App Key not set. Please check settings