ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি ছিলেন ইরানের একজন শক্তিশালী নেতা। তিনি কার্যত প্রধান নেতার ভূমিকা পালন করতেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের মূল স্থপতি হিসেবে তিনিই সামনে আসেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাঁর হত্যাকাণ্ড যুদ্ধ শেষ করার যে কোনো ভবিষ্যৎ প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। এতে এক দীর্ঘ যুদ্ধের কবলে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব।
৬৭ বছর বয়সে লারিজানি ইরানের শাসন কাঠামোয় এক মূর্তমান প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন তিনি। এর পরও গত সপ্তাহে তেহরানে একটি জনসভায় অংশ নিতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহজুড়ে লারিজানি সামাজিক মাধ্যমেও বেশ সক্রিয় ছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও প্রতিশোধের হুমকি দিচ্ছিলেন। গত সোমবার মুসলিম বিশ্বকে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আপনারা জানেন, আপনাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আনুগত্য নেই এবং ইসরায়েল আপনাদের শত্রু। এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করুন এবং এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি বিমান হামলায় লারিজানির মৃত্যু ইরানের নেতৃত্বকে তাদের অন্যতম বিচক্ষণ ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর থেকে বঞ্চিত করবে। এই পরিস্থিতি যুদ্ধ শেষ করার যে কোনো আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর অস্থিরতার মধ্যে বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির মৃত্যুর পরের দিনগুলোতে লারিজানি ইরানের কার্যত নেতা হয়ে উঠেছিলেন।
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজির মতে, লারিজানি ছিলেন ইরানের শাসন কাঠামোর একজন শক্তিশালী ব্যক্তি, যিনি কয়েক দশক ধরে দেশ পরিচালানা ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিলেন। এটা তাঁকে অভিজাত শ্রেণির বিভিন্ন অংশের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দিয়েছিল। তিনি মনে করেন, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ব্যক্তিবিশেষের ক্ষতি সত্ত্বেও টিকে থাকার জন্য প্রস্তুত; কিন্তু এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব প্রতিস্থাপন করা সহজ নয়।
গত বছরের জুন মাসে এবং বর্তমান সংঘাতে ইসরায়েলি হামলায় অনেক অভিজ্ঞ ইরানি কমান্ডার ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কিন্তু ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান লারিজানির এই ক্ষতি ভিন্ন মাত্রার। তিনি হয়তো সবসময় লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না।
ব্যক্তিগত পরিকল্পনা ও আলোচনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরেও লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সবচেয়ে পছন্দের ছিলেন। তবে ইরানি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়নের পক্ষে চাপ সৃষ্টি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনায় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ এবং সামরিক অভিযানের কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইসরায়েল তার দিকে দৃষ্টি ফেরায়।
আজিজি বিশ্বাস করেন, যুদ্ধের অবসানে সম্ভাব্য চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একমত করতে লারিজানির মতো ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন হবে।
অর্ধ শতাব্দী ধরে সেবা
প্রায় পাঁচ দশক ধরে লারিজানি শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি), নিরাপত্তা সংস্থা, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং সংসদে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ লারিজানির দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রশংসা করে তাঁকে এমন একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছে– যিনি জীবনের একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইরানের অগ্রগতির জন্য কাজ করেছেন। বাহ্যিক হুমকির মুখেও ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে এই ধরনের কর্মজীবন তুলনামূলকভাবে বিরল। তাঁর জীবনবৃত্তান্তে একমাত্র যে পদটির অভাব ছিল, তা হলো প্রেসিডেন্টের পদ। আজিজির মতে, লারিজানি ছিলেন ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তনশীল রাজনীতির একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক।
লারিজানি ১৯৮০-এর দশকে ইরাক যুদ্ধের সময় আইআরজিসির একজন কমান্ডার ছিলেন এবং পরে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমের প্রধান হন। শতাব্দীর প্রথম দশকে লারিজানি ছিলেন ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক। পশ্চিমা কূটনীতিকরা তাঁকে বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
This post was created with our nice and easy submission form. Create your post!


GIPHY App Key not set. Please check settings