in

ঈদুল ফিতরের একাল সেকাল!

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ-এ কথা শুধু একটি আবেগের উচ্চারণ নয়; এটি একটি সভ্যতার দীর্ঘ সাধনার ফসল। এক মাসের সিয়াম-সাধনা শেষে যে উজ্জ্বল প্রভাত আসে, তার নাম ঈদুল ফিতর।

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ-এ কথা শুধু একটি আবেগের উচ্চারণ নয়; এটি একটি সভ্যতার দীর্ঘ সাধনার ফসল। এক মাসের সিয়াম-সাধনা শেষে যে উজ্জ্বল প্রভাত আসে, তার নাম ঈদুল ফিতর। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মসংযম, তাকওয়া, কৃতজ্ঞতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, দানশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বোধের শিক্ষা। আবার ইতিহাসের ধারায় এটি কখনো রাজকীয় আড়ম্বর, কখনো উপনিবেশিক সীমাবদ্ধতা, কখনো জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, আবার কখনো বৈশ্বিক সংকটের মুখে মানবতার পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। তাই “ঈদুল ফিতরের একাল সেকাল” শিরোনামে আমাদের আলোচনায় ইতিহাস, ধর্মীয় তাৎপর্য, মুঘল ঐতিহ্য, বাংলার সামাজিক রূপান্তর এবং সমকালীন বাস্তবতা-সবই সমান গুরুত্ব পাবে।

ঈদের ধর্মীয় ভিত্তি: তাকওয়া ও কৃতজ্ঞতার উৎসব

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি-যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)। আবার বলা হয়েছে: “আর যেন তোমরা নির্ধারিত সংখ্যা পূর্ণ কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে সুপথ দেখিয়েছেন তার জন্য তাঁর মহিমা ঘোষণা কর এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫) এই দুই আয়াতেই রমজান ও ঈদের মৌলিক দর্শন স্পষ্ট, রমজান মানুষকে তাকওয়ায় উন্নীত করে, আর ঈদ সেই তাকওয়ার কৃতজ্ঞতাময় উদযাপন।

বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দুটি আনন্দ দিবসকে ইসলামি রূপ দেন-ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। হাদিসে এসেছে: “লিকুল্লি কাওমিন ঈদ, হাযা ঈদুনা”-প্রত্যেক জাতিরই উৎসব আছে, এটি আমাদের উৎসব। হিজরি দ্বিতীয় সনে রমজান ফরজ হয় এবং বদরের যুদ্ধের পর প্রথম ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। খোলা ময়দানে জামাতে দুই রাকাত নামাজ ও খুতবার মাধ্যমে ঈদের আনুষ্ঠানিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে আনন্দ আছে, কিন্তু তা সংযমের ভিতরে; উল্লাস আছে, কিন্তু তা আল্লাহভীতির আবরণে।

ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ সদকায়ে ফিতর। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে সবার ঘরে ঈদের হাসি পৌঁছে দেওয়ার জন্যই সদকায়ে ফিতির ওয়াজিব করা হয়েছে। হাদিসে আছে-ফিতরা আদায় না করা পর্যন্ত রোজা আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলন্ত থাকে। অর্থাৎ ঈদের আনন্দ সামাজিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই পরিপূর্ণ হয়। আসে মুসলমান সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব।

উপমহাদেশে ঈদের বিস্তার: সুলতানি থেকে মুঘল যুগ

বাংলায় ইসলামের আগমন সুলতানি আমলে হলেও ঈদকে ব্যাপক সামাজিক উৎসবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মুঘল যুগ গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক মিনহাজ উস সিরাজ তাঁর ‘তাবাকাত-ই-নাসিরী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, সুলতানরা রমজানে ধর্মীয় আলোচনা ও দাওয়াতের ব্যবস্থা করতেন। তবে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঈদের শোভা-জাঁকজমক বৃদ্ধি পায় মুঘল আমলে।

প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর-এর দরবারে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের চিত্র পাওয়া যায় ঐতিহাসিক চিত্রাঙ্কনে। পরবর্তী সময়ে সম্রাট শাহজাহান-এর আমলে প্রাদেশিক প্রশাসনে ঈদের আনুষ্ঠানিকতা আরও সুসংহত হয়। বাংলায় সুবেদারদের উদ্যোগে ঈদগাহ নির্মাণ, মিছিল ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালু ছিল।

১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার আমলে ধানমন্ডিতে যে শাহী ঈদগাহ নির্মিত হয়, তা আজও ঐতিহাসিক নিদর্শন। এই স্থাপনাটি ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ নামে পরিচিত। প্রায় ১৪৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৩৭ ফুট প্রস্থের এই ঈদগাহ চারদিক থেকে উঁচু প্রাচীরঘেরা ছিল। প্রথমদিকে এটি অভিজাতদের জন্য সীমিত থাকলেও পরে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়-যা সামাজিক অন্তর্ভুক্তির এক দৃষ্টান্ত।

মুঘল আমলে ঢাকায় ঈদ মিছিল ছিল এক বর্ণাঢ্য আয়োজন। নিমতলী প্রাসাদ, চকবাজার, হোসেনি দালান প্রভৃতি স্থাপনার সামনে দিয়ে হাতি-উট-পালকিতে সজ্জিত শোভাযাত্রা চলত। বাদশাহী বাজারে (বর্তমান চকবাজার) বসত ঈদমেলা। কাঠের খেলনা, মিষ্টান্ন, বাকরখানি, সেমাই-সব মিলিয়ে উৎসব হয়ে উঠত সর্বজনীন।

ঐতিহাসিক মির্জা নাথান তাঁর বিবরণে লিখেছেন-চাঁদ দেখা গেলে শিবিরে রণশিঙ্গা বাজত, কামান দাগানো হতো, আতশবাজির ঝলকানিতে আকাশ আলোকিত হতো। এতে বোঝা যায়, ঈদ ছিল একদিকে ধর্মীয়, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক শক্তিরও প্রদর্শন।

উপনিবেশিক সময়: সীমাবদ্ধতার মধ্যেও টিকে থাকা ঈদ উৎসব

ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিক প্রাধান্য ছিল খ্রিষ্টীয় উৎসব বড়দিনের দিকে। তবুও মুসলমান সমাজে ঈদের ধারাবাহিকতা থেমে যায়নি। গ্রামবাংলায় ঈদগাহে নামাজ, কোলাকুলি, সেমাই রান্না-সবই চলতে থাকে। শিক্ষার প্রসার কম থাকলেও মক্তব ও মাদরাসা কেন্দ্রিক ধর্মীয় অনুশীলন ঈদের চেতনা ধরে রাখে।

ঊনবিংশ শতকে আলম মুসাওয়ারের আঁকা ঢাকার ঈদ মিছিলের ৩৯টি চিত্র আমাদের জানায়-ঈদ ছিল সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। ব্রিটিশ আমলেও ধর্মীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদা রক্ষায় ঈদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ: জাতীয় জীবনে ঈদের ভূমিকা

পাকিস্তান আমলে ঈদ রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃত হয়। রেডিও পাকিস্তান ও পরবর্তীতে টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ঈদ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ, ঈদসংখ্যা, নাটক, গান-সবই ঈদকে সামাজিক সংহতির মঞ্চে পরিণত করেছে।

গ্রাম থেকে শহরে, প্রবাস থেকে দেশ-সবখানে ঈদ এখন বৈশ্বিক সংযোগের সেতু। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়কে বিশ্বায়িত করেছে পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে।

খাদ্য ও সংস্কৃতি: ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

মুঘল আমলে ঈদের সকালে বাকরখানি, শাহি সেমাই, কোরমা, মোরগ পোলাও পরিবেশন হতো। আজও সেমাই ঈদের প্রধান অনুষঙ্গ। তবে খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য এসেছে-বিরিয়ানি, ফিরনি, কাবাব, ফিউশন ডেজার্ট ইত্যাদি যুক্ত হয়েছে ঈদ উৎসব।

পোশাকে এসেছে পরিবর্তন। আগে হাতে সেলাই করা পাঞ্জাবি, শাড়ি প্রধান ছিল; এখন রেডিমেড, ডিজাইনার কালেকশন জনপ্রিয়। তবুও নতুন পোশাক পরার আনন্দ অপরিবর্তিত।

সামাজিক দায়িত্ব: ফিতরা, যাকাত ও মানবতা

ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত আছে সামাজিক ন্যায়বোধে। কুরআনের শিক্ষা-প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে তৃপ্ত হওয়া ঈমানের পরিপন্থী। তাই ফিতরা ও যাকাতের মাধ্যমে দরিদ্রের মুখে হাসি ফোটানো ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারির সময়-যেমন কোভিড-১৯-আমরা দেখেছি কিভাবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষ ঈদের আনন্দে একজন অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। ২০২০-২১ সালে মসজিদে সীমিত জামাত হলেও ঘরে ঘরে ঈদের নামাজ আদায় হয়েছে; অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে। এতে প্রমাণিত-ঈদের মূল চেতনা স্থান বা আড়ম্বরের উপর নির্ভরশীল নয়; নির্ভরশীল নিয়ত ও মানবিকতার উপর।

একালের চ্যালেঞ্জ: ভোগবাদ বনাম তাকওয়া

সমকালীন সমাজে ঈদ অনেক সময় ভোগবাদের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। শপিংমল, বিজ্ঞাপন, সামাজিক মাধ্যমে প্রদর্শন-সব মিলিয়ে ঈদের আধ্যাত্মিকতা আড়ালে পড়ে যায়। অথচ হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে- “ঈদের আনন্দ তার জন্য, যে আল্লাহকে ভয় করে। নতুন পোশাক নয়, বরং নতুন চরিত্রই ঈদের আসল অর্জন”।

অতিরিক্ত অপচয়, শব্দদূষণ, পরিবেশদূষণ-এসবও আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। মুঘল আমলে কামান দাগানো ছিল শক্তির প্রদর্শন; আজ পরিবেশবান্ধব উদযাপন সময়ের দাবি।

একালের সম্ভাবনা: প্রযুক্তি, প্রবাস ও বিশ্বায়ন

আজ বিশ্বের প্রায় সব দেশে মুসলমানরা ঈদ উদযাপন করেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা-সবখানে ঈদ এখন আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপের সুযোগ। বাংলাদেশি প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে ঈদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেন। অনলাইন কোরবানির প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ফিতরা প্রদান-সবই প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার।

উপসংহার: ঐতিহ্য ও চেতনার সমন্বয়

ঈদুল ফিতরের একাল সেকাল পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি-এর রূপ বদলেছে, কিন্তু মূল সুর বদলায়নি। তাকওয়া, কৃতজ্ঞতা, ভ্রাতৃত্ব, দানশীলতা-এই চার স্তম্ভেই দাঁড়িয়ে আছে ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য। মুঘল আমলের শাহী ঈদগাহ থেকে আজকের জাতীয় ঈদগাহ; কামানের শব্দ থেকে তাকবিরের ধ্বনি; শোভাযাত্রা থেকে ডিজিটাল শুভেচ্ছা-সবই সময়ের বিবর্তন।

আমাদের দায়িত্ব-ঐতিহ্যকে ধারণ করে সমকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কুরআন হাদিসের আলোকে ঈদ উৎসব করা। ঈদ যেন কেবল এক দিনের উল্লাস না হয়ে ওঠে; বরং সারা বছরের নৈতিকতার প্রেরণা হয়ে থাকে। রমজানের শিক্ষা-সংযম, আত্মশুদ্ধি, সহমর্মিতা-যদি আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি, তবেই ঈদ হবে সফল।

আসুন ২০২৬ সালে বর্তমান অবস্থায়ও ধনী-দরিদ্র, শহর-গ্রাম, দেশ-প্রবাস-সব ভেদাভেদ ভুলে ঈদের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হই। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করি, এবং রমজান ও ঈদের শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাই একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহমর্মী সমাজ গঠনের পথে। ইনশাআল্লাহ।

লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

This post was created with our nice and easy submission form. Create your post!

Report

What do you think?

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

GIPHY App Key not set. Please check settings

Loading…

0

এত ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে ছুড়ছে ইরান!

বাউবির নতুন ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান