লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন আমিষ থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে চায়। এমনকি এমনও লক্ষাধিক মানুষ আছে যার প্রাণিজ সকল উপাদান (দুধ, ডিম ইত্যাদি) তাদের খাদ্যতালিকা থেকে দূরে রাখে। মানুষের খাদ্যতালিকার পছন্দ-অপছন্দ অনলাইন জগতে বহুল আলোচিত বিষয়। এজন্য আমরা নিরামিষী হওয়ার ৫টি উপকারিতা এবং ৫ টি অপকারিতা আমরা দিচ্ছি। এখন আপনি আমিষ খাবেন কি খাবেন না, সেই সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব আপনার।
নিরামিষী হবার আগে যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখবেন।

1. সবজিতে খরচ বেশী আর রাঁধতেও ঝামেলা

সবজিতে খরচ বেশী আর রাঁধতেও ঝামেলা

শুনতে অবাক মনে হলেও সবজিতে খরচ বেশী। বাজারে ব্রয়লার মুরগী, ডিম, পাঙ্গাস মাছ ইত্যাদির অনুপাতে ফল শাকসবজির বাজার বেশ চড়া। উপরন্তু সবজি রান্না করা, কাটা-বাছা করাও বেশ ঝামেলার। 

2. নিরামিষী খাদ্যাহার স্বাস্থ্যের জন্য খারপ যদি যথাযথভাবে না মানা যায়

নিরামিষী খাদ্যাহার স্বাস্থ্যের জন্য খারপ যদি যথাযথভাবে না মানা যায়

প্রায়শই এরকম বলা হয়ে থাকে যে নিরামিষী ভোষ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না। কারন দেহের জন্য প্রয়োজনীয় যে ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান মাংসে বিদ্যমান থাকে সেটা নিরামিষ আহারের দ্বারা সম্ভব না। আমরা এটা বলছি না নিরামিষী খাদ্যাহার স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। কিন্তু যথাযথভাবে নিয়ম মেনে নিরামিষ খাওয়া বেশ কঠিন। যেমন ভিটামিন বি-১২ প্রাণীজ আমিষে বিদ্যমান। এখন আপনি যদি নিরামিষী হয়ে থাকেন, তবে আপনাকে স্বাস্থ্যঝুকি এড়াতে ভিটামিন বি-১২এর সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে। 

3. সবজির অস্বভাবিক চাহিদা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে

সবজির অস্বভাবিক চাহিদা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে

নিরামিষভোজীদের মধ্যে একটা জনপ্রিয় কথন আছে যে, যদি হঠাৎ করে পৃথিবীর সবাই মাংস খাওয়া ছেড়ে দেয় তাহলে সবকিছু ভালো হবে।বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ কমে যাবে, মানুষ বেশী দিন বাঁচতে শুরু করবে, রোগ-শোক কমে যাবে। কিছু গবেষণা হয়তো এই তত্ত্বকে সমর্থন করে। কিন্তু এর জন্য সবাইকে বদলে যেতে হবে। যেটা প্রায় অসম্ভব। আর পছন্দ করুন বা নাইই করুন মানুষ আমিষ খাবেই। 

কিন্তু একবার ভাবুন যদি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ নিরামিষী হয় তাহলে যে সীমাবদ্ধ কৃষিজমি আছে তা কি আমাদের চাহিদা মিটাতে পারবে?এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রাণীজ আমিষের সমপরিমান সবজি উৎপাদনে দ্বিগুণ যোগান লাগে। আর পর্যাপ্ত বিনিয়োগ কাজে লাগিয়েও সারা বছর মৌসুমী ফল-ফলাদি উৎপাদন সম্ভব না।এছাড়া কৃষি চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে যে রাসয়নিক সার বা হাইব্রীড শস্য উৎপাদন করবে তাও পরিবেশ বান্ধব নয়। 

4. নিরামিষী খাদ্যাভাস তারপরও লক্ষাধিক প্রাণীর ক্ষতির কারন হতে পারে

নিরামিষী খাদ্যাভাস তারপরও লক্ষাধিক প্রাণীর ক্ষতির কারন হতে পারে

সমস্যা হলো, প্রাণীদের ক্ষতি না করে মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন সম্ভব নয়। ধানের ক্ষেতের কীটনাশক ফসলের জন্য ক্ষতিকারক পোকামাকড়, ইদুর মারে, তারাও তো জীব। স্টিভেন ডেভিস নামের এক গবেষক একটি বৈচিত্রময় প্রতিবেদন বের করেছিলেন নৈতিকতার সংকটের উপর। যেখানে দেখানো হয়েছিলেন মাংসের জন্য হত্যা করার থেকে অনেক বেশী প্রাণী হত্যা করা হয় নিছক দুর্ঘটনাবশত। আমরা এমন প্রশ্নের জবাবে বলব না যে আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত। আমরা কেবল এই প্রবন্ধ থেকে শুধু এতটুকুই বলতে পারি (ডেভিডের মতে), “আমাদের কারও হাতই অন্য প্রাণীদের রক্তের দাগ থেকে মুক্ত নয়, এমনকি নিরমিষভোজীরাও নন।” তাই শুধু যদি নৈতিকতার জন্য কেউ নিরামিষভোজী হন, তাহলে আসলে একটু বেশীই নাটুকেপানা হবে। 

5. নিরামিষীদের স্বাস্থ্যঝুকি বেশী

নিরামিষীদের স্বাস্থ্যঝুকি বেশী

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে নিরামিষীদের একটি পুষ্টিকর সুষম খাদ্য তালিকা বজায় রাখার জন্য একটি সমন্বিত, স্থায়ী প্রচেষ্টা করতে হবে। যদিও উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক নিরামিষভোজী সেটা করেন না এই সমস্যা সৃষ্টি হয় যেখানে থেকেই।

২০১৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিরামিষভোজী বা নিরামিষাশী জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিলো তাদের "রুগ্ন স্বাস্থ্য" হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল, যা তাদের খাদ্যাভাসের মধ্যে পাওয়া প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে ছিল।যদিও এটা ততটা খারাপ না, একই গবেষণায় দেখা গেছে যে মাংস খাওয়াতে কিছু সুবিধা রয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে আমিষ সেবকদের চেয়ে নিরামিষভোজীদের দেহের ভর (BMI) কম  ছিল।

6. এবার নিরামিষভোজী হবার উপকারী দিকগুলো এবার তুলে ধরা হলো।

এবার নিরামিষভোজী হবার উপকারী দিকগুলো এবার তুলে ধরা হলো।

নিরামিষভোজীরা সাধারনত চিকন স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে থাকেনঃ 

আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি কিভাবে আপনি প্রতিদিন নিজেকে জাঙ্ক খাবারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে এখনও নিরামিষভোজী হতে পারেন। তবে, গবেষণা যে দেখানো হয়েছে, আমিষ সেবকদের চেয়ে নিরামিষভোজীদের দেহের ভর (BMI) কম  ছিল। এর কারন মূলতঃ তাজা ফল এবং সবজি কদাচিৎ সংশ্লেষিত ফ্যাট ধারণ করে এবং বাদাম এবং বীজ খাদ্যাভাসে থাকার কারনে শরীরের চর্বিগুলো সহজেই বিপাকযুক্ত হয়।নিরামিষভোজীদের কম কলেস্টেরল এবং বেশী ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়ার কারনে, রেডমিট (Red Meat) সেবী একটি ব্যক্তির চেয়ে ধমনি এবং পয়নালী পরিষ্কার থাকে। অন্য কথায়, যদি আপনি ওজন কমাতে চান, তবে নিরামিষভোজী হওয়া অপনাকে সাহায্য করতে পারে, কারণ স্বাভাবিকভাবেই আপনার খাদ্যতালিকা থেকে চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিতে হয়। 

7. একটি (ভাল) নিরামিষভোজীর খাদ্যতালিকা হতে হবে ভিটামিন এবং খনিজ সমৃদ্ধঃ

একটি (ভাল) নিরামিষভোজীর খাদ্যতালিকা হতে হবে ভিটামিন এবং খনিজ সমৃদ্ধঃ

পূর্বে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটাও সত্য যে, আমিষে যে নির্দিষ্ট খনিজ পদার্থ এবং ভিটামিন পাওয়া যায় নিরামিষভোজীদের তা খাদ্যতালিকায় আনতে অনেক সচেতন হতে হবে কিন্তু এর বিপরীতটাও হতে পারে।সাধারণ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার এবং খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত খনিজ পদার্থ এবং ভিটামিন খাদ্য তালিকায় রেখে নিরামিষভোজীরা এ সমস্যার থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। এছাড়া বাড়তি মেদের ঝুকি থেকেও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, "নিরামিষভোজী খাদ্যগুলি হ'ল ফাইবার, ফোলিক অ্যাসিড, ভিটামিন সি এবং ই, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, এবং অনেক ফাইটকোকেমিক্যালস এবং চর্বিযুক্ত খাবার থেকে দূরে থাকা -স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো।" আমরা হয়তো এসব সমস্ত দীর্ঘ, চিত্তাকর্ষক শব্দের অর্থগুলি জানি না, তবে এতটুকু স্পষ্ট বোঝা যায় যে নিরামিষ আহার সুস্বস্থ্যের নিশ্চয়তা দেয়।

8. এটি আপনার শরীরকে বেশী "এন্টিঅক্সিডেন্ট" করতে পারে

এটি আপনার শরীরকে বেশী "এন্টিঅক্সিডেন্ট" করতে পারে

'অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট' সম্ভবত এমন একটি শব্দ যা আপনি হয়তো প্রায়শই শুনে থাকবেন। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি সম্পূর্ণ শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলির ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে এবং এর প্রতিরোধের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অসুস্থতা ও সমস্যা থেকে রক্ষা করে।তাহলে এই জাদুকরী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি কোথায় পাওয়া যায়? এর বেশিরভাগই পাওয়া যায় ফল এবং সবজি থেকে, যা নিরামিষ।

9. একটি নিরামিষ খাদ্য আপনার সামগ্রিক মেজাজকে উন্নত করতে পারে (স্বল্পমেয়াদী)

একটি নিরামিষ খাদ্য আপনার সামগ্রিক মেজাজকে উন্নত করতে পারে (স্বল্পমেয়াদী)

বার্ট সিম্পসন একবার বলেছিলেন, "সালাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না।" এই যুক্তিটির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, একটি গবেষণা রয়েছে, যা দেখায় যে, মাংস খাওয়া সব সময় ভালও নয়। ২০১২ সালে একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখার চেষ্টা করা হয়েছিলো যে, খাদ্যাভাস মানুষের মেজাজের উপর কিরকম প্রভাব ফেলে। দেখা যায় যে, টানা দুই সপ্তাহ সবসময় "মাংস, মাছ এবং হাঁস" খাওয়ার ব্যক্তিদের মেজাজ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও গবেষণাকর্মটি ছোট ছিল এবং এর কোনও পরিণামযোগ্য ফলাফল ছিল না। তবে গবেষণাটিতে দেখা যায়, যে কয়েকটি অতিরিক্ত আপেল খাওয়া কিছু লোক মেজাজ সংযমী রাখতে সক্ষম হয়েছে।তবে এখানে এটাও উল্লেখ করা উচিত যে, এর বিপরীতে গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিরামিষভোজীরা দুর্বল মেজাজ এবং এমনকি বিষণ্নতায় ভুগে থাকে। যাইহোক, বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ, এটিকে আয়রনের অভাবের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসাবে বিবেচিত করেন।

10. নিরামিষ খাদ্যআভাস হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি কমায়

নিরামিষ খাদ্যআভাস হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি কমায়

এটি সম্ভবত তালিকাতে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে,  নিরামিষ খাবারের সাহায্যে আপনি ভয়ঙ্কর রোগগুলি থেকে রক্ষা পেতে পারেন- বিশেষ করে হৃদরোগে। হৃদরোগের জন্য দায়ী হলো ধূমপান, লাল এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস যা নিরামিষভোজীরা খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে থাকেন। উপরন্তু, প্রচুর পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়া সমস্ত ধরণের ক্যান্সারের ঝুকি বাড়ায়। 

YOUR REACTION?

Facebook Conversations