যেভাবে সালাতে মনোযোগী হবেন। এবং ৬টি সহজ উপায়।

দিন ও ইসলাম।

ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সফলতা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙখলা, আনুগত্য, সময়ানুবর্তিতা ও দলবদ্ধতা;  যা কেবল সালাত আদায় করার মাধ্যমেই সম্ভব। কেউ যদি সালাতে তথা নামাজে মনোযোগী হতে না পারে, তাহলে এ সফলতা অর্জন তার পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোর‘আনের সূরা মাউনে বলেছেন-‘দুর্ভোগ সে সব সালাত আদায়কারীর, যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন’ (১০৭ : ৫ ও ৬)। অনেকে শত চেষ্টা করেও সালাতের মাঝে মনোযোগ সৃষ্টি করতে পারেন না, কিভাবে মনকে ধরে রাখতে হয় তাও জানেন না। 

এ  ব্যাপারে ইমাম আবু হামিদ আল গাজালি, রাহমাতুল্লাহ, তাঁর বিখ্যাত ‘এহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি মানব মনের ছয়টি অবস্থার কথা বর্ণনা করেন, যা না থাকলে সালাতে মনোযোগী হওয়া যায় না।

প্রথম উপায় : সালাতে ‘হুজুরে দিল’ বা অন্তরের উপস্থিতি থাকা ; এটি সালাতের প্রাণ। মানুষের মন কখনো বেকার থাকে না; হয় সালাতে থাকে, না হয় অন্যত্র থাকে। সালাতে দাঁড়ালে শয়তান বারবার মানুষের মন ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু মানুষকে তা ধরে রাখতে হয়। বড় কোনো মানুষের সাথে কথা বলার সময়, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার খাতায় লেখার সময় বা সমাবেশে বক্তৃতা দেয়ার সময়ে মানুষ সে কাজের প্রতি তাদের যেভাবে পূর্ণ মনোযোগ রাখে, সালাতের সময়ে তেমন মনোযোগ রাখে না। অথচ, সালাত পৃথিবীর সব কাজের বড় কাজ; এখানে পূর্ণ মনোযোগ থাকা একান্তই কর্তব্য। 

যারা কিছুতেই সালাতে মন ধরে রাখতে পারে না, তাদের জন্য একটি অনুশীলন খুবই ফলপ্রসূ হয়। অনুশীলনটি হল : দাঁড়ানো থেকে রুকুতে যাবার আগে, রুকু থেকে সিজদায় যাবার আগে কিংবা সিজদা থেকে বসার আগে, প্রত্যেক অবস্থান পরিবর্তনের পূর্বে মনের অবস্থা দেখে নেয়া। তারপরেও যদি সালাতে মনোযোগ না থাকে, তাহলে তাসবীহগুলো মনোযোগের সাথে আরেকবার পড়তে হবে; এভাবে যতবার মনোযোগ না আসবে, ততবার পড়তে থাকলে এক পর্যায়ে সালাতে মনোযোগ ফিরে আসতে বাধ্য হবে।

দ্বিতীয় উপায় : সালাতে যা কিছু পাঠ করা হয় তার অর্থ বুঝতে চেষ্টা করা। এটি অন্তরের উপস্থিতিকে আরো দৃঢ় করে। সালাতে সূরা ফাতিহা, বিভিন্ন কিরাত ও তাসবীহগুলোর অর্থ যখন জানা হয়ে যাবে তখন তা ভালোভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। কোনো কোনো আলেম সালাতে যতবার সূরা ফাতেহা পাঠ করেন, ততবার তাদের নিকট ভিন্ন ভিন্ন অর্থ অনুধাবন হয়, তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন দিক-নির্দেশনা পান।

তৃতীয় উপায় : সালাতে আল্লাহর প্রতি ‘তাযীম’ বা ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। সাধারণত দুটি কারণে মনে আল্লাহর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা সৃষ্টি হয়। এক. আল্লাহতায়ালার প্রতাপ ও মাহাত্ম্যের জ্ঞান লাভ করলে; যার এ জ্ঞান নেই, তার মন আল্লাহর সামনে নত হয় না। দুই.  নিজের অজ্ঞতা-হীনতা-নীচতা-সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানা থাকলে মানুষ আল্লাহকে মন থেকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করতে পারে।

চতুর্থ উপায়: সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহতায়ালাকে ভয় করা। কেবল জ্ঞান থেকেই ভয়ের উত্পত্তি সম্ভব; যে-মানুষ যত জ্ঞানী, তিনি আল্লাহকে তত ভয় করেন। কোরআনে বলা হয়েছে-‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে’ (সূরা ফাতির-২৮)।

পঞ্চম উপায় : সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আশা করা। আল্লাহতায়ালা বলেন-‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর’ (সূরা বাক্বারা-৪৫)। সাধারণত সালাতের সময় পার্থিব চিন্তা এসে মানুষের মনে ভিড় জমায়; কিভাবে পার্থিব সফলতা অর্জন করা যায়, মানুষ কেবল সে চিন্তাই করে। তারা পার্থিব কল্যাণের চিন্তায় এতই ব্যস্ত থাকে যে, সালাতে মন বসাতে পারে না। অথচ, জ্ঞানীরা সালাতের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আশা করে, যেখানে চাহিদা অনুযায়ী সফলতা অর্জন করার সম্ভাবনা শতভাগ নিশ্চিত।

ষষ্ঠ উপায় : সালাতে ‘হায়া’ বা লজ্জাশরম নিয়ে আসা। গ্রামের মানুষ শহরে এসে যদি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে না পারে, তাহলে লজ্জাবোধ করে। অথচ আল্লাহর সামনে সালাতে দাঁড়িয়ে মানুষ শতশত ভুল করে, কিন্তু লজ্জাবোধ করে না।

উপরের ছয়টি উপায় অনুসরণ করলে সালাতে মনোযোগ তৈরি হবে। যদি না হয়, বুঝতে হবে আমাদের ঈমানের দুর্বলতা আছে।