রঙের দুনিয়া

রং, বিজ্ঞানের ভাষায় রং-এর উৎপত্তি মানুষের অনুভূতিতে। অর্থাৎ আমাদের চোখের রড কোষের কম্পনের তারতম্যের কারণে আমাদের দর্শন অনুভূতিতে নানান রঙের সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রং-এর গুরুত্ত্ব যতটাই কম, শিল্পীর কাছে রঙ ততটাই মহার্ঘ্য। তার কাছে রং-এর অর্থ জীবন। উৎপত্তি থেকে আজ পর্যন্ত শিল্পীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ওপছন্দের উপর নির্ভর করে অনেক পরিবর্তীত ও পরিমার্জিত হয়েছে রঙ-এর গতি প্রকৃতি। রঙ-এর বিস্তার ও ক্রমধারার আদ্যপান্ত নিয়ে লিখেছেন সাজিদুল হক শুভ।

গুহায় বসবাসরত মানুষেরা নিজেদের চারপাশকে সাজানো ও সুন্দর করার লক্ষ্যে এবং ধর্মবিশ্বাস থেকে গুহার দেয়ালে অঙ্কনকরত নানান ছবি। প্রথমদিকে এইসব ছবি আঁকা হতো ধারালো কোনো তীক্ষ্ণ বস্তুর আঁচড়ে, গুহার দেয়ালে শুধুমাত্র রেখার মাধ্যমে। ছবি আঁকার এই ধারা প্রচলনের অনেক পরে, আজ থেকে প্রায় ১৫০০০ বছর পূর্বে আদিম যুগের গুহা মানবরা তাদের ছবিতে রঙ-এর ব্যবহার শুরু করে। তখন তারা তাদের ব্যবহারের জন্য রঙ তৈরি করত প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান থেকে। তখনকার মানুষের ব্যবহৃত রঙ-এর প্রধান উপাদান ছিল পশুর চর্বি। পশুর চর্বি ব্যবহৃত হতো রঙকে স্থায়ী করার জন্য ও রঙকে জমাট বাঁধানোর কাজে সাহায্যের জন্য। গুহা চিত্রগুলো বিশ্লেষন করে দেখা যায়, তখনকার ব্যবহৃত রঙ-এর সংখ্যা ছিল ৪। লাল,হলুদ,কাল এবং সাদা। লাল মাটি এবং হলুদ মাটিকে চর্বির সাথে মিশিয়ে তারা লাল ও হলুদ রঙ তৈরি করত। এছাড়াও সাদা চক এবং কার্বণকে একই পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করে তারা তৈরি করত সাদা এবং কালরঙ। আদিম মানুষের তৈরি এই রঙই মানুষের তৈরি প্রথম রঙ। এই রঙকে বলা হয় পিগমেন্ট। আর্থ পিগমেন্ট থেকে সরাসরি রঙটি তৈরি হত বলে একে পিগমেন্ট নামকরন করা হয়। পিগমেন্ট অনেক বেশি স্থায়ী, যার প্রমান স্বরুপ আমরা প্রাচীন গুহা চিত্রগুলো সম্পূর্ণ অক্ষত ও অবিকৃত অবস্থায় দেখতে পাই। চিত্রকলার পিগমেন্টের পরবর্তীতে যে রঙ-এর পরিচয় পাওয়া যাই সেটিও পিগমেন্ট নামেই পরিচিত। ৪০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ইজিপ্সিয়ানরা এই রঙ-এর উদ্ভাবক। তারা আর্থ পিগমেন্টগুলোকে আরো পরিষ্কার ও পরিশুদ্ধ করে এই রঙ প্রস্তুত করতো। যার কারণে ইজিপ্সিয়ান পিগমেন্টের টেম্পার অনেক বেশি এবং এগুলো অনেক বেশি উজ্জ্বল। ইজিপ্সিয়ানদের সব থেকে বড় আবিষ্কার ছিল ইজিপ্সিয়ান ব্লু-যেটি প্রথম তৈরি হয় ৩০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে। মিশরীয়দের এই সাফল্যের সবথেকে বড় কারণ ছিল তাদের খনিজের ব্যবহার। তারা বিভিন্ন খনিজ ব্যবহার করে এই রঙ-এর প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিল। ইজিপ্সিয়ানরা ব্লু তৈরি করত কপার ও কালির সমন্বয়ে। যা তখন মাটিতে গুরা রূপে পাওয়া যেত। মিশরিয়রা মালাচিট, আজিরাইট এবং চিনাকর ব্যবহার করতো খনিজকে ভাঙ্গা ও ধোয়ার কাজে। পরবর্তীতে বিনাবাইট সার্বাধিক ব্যবহৃত হয়েছিল উজ্জ্বল লাল রঙ হিসেবে। ইজিপ্সিয়ান পিগমেন্টের পরে গ্রিক ও রোমানরাও রঙ-এ কিছু উন্নতি সাধনের চেষ্টা করলেও খুব বেশীবড় ধরনের পরিবর্তন তাতে সাধিত হয়নি। তারা পশু-পাখির মলের সাথে ভিনেগারের সংমিশ্রনে নতুন ধরনের পিগমেন্ট তৈরি করে এবং এই পিগমেন্টের সাথে কিছু ক্ষেত্রে তেলের সংমিশ্রনের চেষ্টাও চালায়।

পিগমেন্টের পরবর্তীতে যে রঙ সবথেকে বেশি আলোড়োন তুলেছিল তা হল তেল রঙ। ১৪’শ শতকের গোড়ার দিকে ইতালির রেনেসাঁর যুগের শুরুতেই এই রঙয়ের প্রচলন শুরু হয়। ইতালিয়ানরা আর্থ পিগমেন্টের সাথে রোস্টিংসিনা এবং আম্বার ব্যবহার করে রঙকে প্রচুর উন্নত করে তোলে। পিগমেন্টের বদলে তেল রঙ ব্যবহারের কারণে তাদের চিত্রকর্মের মান ও দক্ষতা অনেকগুনে বৃদ্ধি পায়।রেনেসাঁ যুগের শিল্পীদের ছবিতে সবুজ ও নীলের ব্যপকতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর প্রধান  কারণ ল্যাপিস ল্যাজুলির পরিবর্তে বিশেষ পাথরের ব্যবহার করে এই দুই রঙের উৎকর্ষ সাধন করা হয় রেনেসাঁ  যুগে।রেনেসাঁ যুগে রঙকে উন্নত করার সাথে সাথে এর জৌলুসতা বাড়ানো এবং এর বাজারজাত করনের প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়। পনেরশ’ শতকেই প্রথমবারের মত রঙ ব্যাপকভাবে বাজারজাত হয় এবং সাধারন মানুষের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুধুমাত্র ব্যবসায়ীরাই ব্যবসায়িক চিন্তা ভাবনা থেকে নয়, শিল্পিদের ছবির মানের উন্নতির চিন্তা থেকেও উন্নতি ঘটে তেল রঙের। এর স্থায়িত্ব এবং উজ্জ্বলতা আরো বেশী বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে শিল্পীরা সূক্ষ্ণ মিহি রঙিন কাঁচের গুড়া এবং নানান রকম রাসায়নিক পদার্থ তাদের রঙ-এর সাথে মিশিয়ে নিয়ে ব্যবহার করতো। কাঁচের গুড়া মিশ্রিত রঙ-এ আকা ছবি অনেক বেশিদিন পর্যন্ত এর উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে পারত। এমন কি ২০০-৩০০ বছর পরেও তা নতুনের মতোই উজ্জ্বল থাকতো। রেনেসাঁ যুগের এই তেল রঙের হাত ধরেই শুরু হয় আধুনিক চিত্রকলার এবং পরবর্তীতে যার বিস্তার ঘটে জল রঙ পর্যন্ত। রঙের সামগ্রিক ইতিহাসের তুলনায় জল রঙের ইতিহাস খুবই ক্ষুদ্র এবং নবীন। রেনেসাঁ যুগের তেল রঙের ব্যাপক প্রভাবের পরপরই জল রঙের আগমনের কারনে শুরুতে তা ছিল ম্রিয়মান। শিল্পীদেরকে এই নতুন শিল্পমাধ্যমে অভ্যস্ত হতেও লেগেছিল বেশ সময়। ১৮৩২ সালে উইলিয়াম উইন্সর এবং হেনরি নিউটন নামের দুইজন চিত্রশিল্পী এবং রসায়নবিদের হাত ধরেই সর্বপ্রথম যাত্রাশুরু করে এই শিল্প মাধ্যমটি। ‘Moist’ water colors বা সনেট জলরঙ নামেই প্রথম এটিকে সবার সামনে নিয়ে আসেন তারা। এই রঙের সব থেকে উল্লেখযোগ্য দিক হলো-এই রঙ ব্রাশে শুধুমাত্র অল্প একটু পানির সাহায্যে ব্যবহার করা যেত। তখনকার সময়ে শুধুমাত্র ভেজা ব্রাশের সাহায্যে ছবি অংকন করতে পারাটা একজন শিল্পীর জন্য ছিল রীতিমত বিস্ময়। এজন্য জলরঙের আবিষ্কার উইলিয়াম উইন্সর এবং হেনরি নিউটনকে এনে দেয় রাতারাতি বিশ্বজোড়া খ্যাতি। জলরঙ ব্যবহার অনেক সহজ হলেও সমস্যা দেখা দেয় এর সংরক্ষনের ক্ষেত্রে। জলরঙ আবিষ্কারের ২ বছর পরই আবিষ্কার হয় ধাতব টিউবের। ধাতব টিউব আবিষ্কার করেন আমেরিকার একজন তেলরঙ শিল্পী। উইলিয়াম উইন্সর এবং হেনরি নিউটন চিন্তাকরে দেখলেন যদি তাদের তৈরি রঙকে এই টিউবে বন্দি করা সম্ভব হয় তবে এটি আরো অনেক বেশিদিন স্থায়ী হবে এবং প্রতিটি রঙকে আলাদা আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে পারলে তা বাজারজাত করা এবং পেটেন্ট করা অনেক  সহজহবে। এই চিন্তা থেকেই উইন্সর প্যাচসহ একটি টিউবের মুখের আবিষ্কার করেন এবং রঙের টিউবের জন্ম হয়। সালে উইলিয়াম উইন্সর এবং হেনরি নিউটনই প্রথম রঙ-এর প্রতিষ্ঠান চালু করেন;যা রঙ স্থায়ী বিন্যাসে বাজারজাত করে এবং এটি বর্তমানেও প্রচলিত। জলরঙ ব্যবহার ও প্রাপ্তি অনেক সহজলভ্য হলেও এই রঙ শিল্পীদের মাঝে তেল রঙ-এর ন্যায় ব্যাপক সাড়া ফেলতে পারেনি এর কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে। তেলরঙের পুরুত্ব অনেক বেশি হওয়ায় এটি কাপড়ের ক্যানভাস, দেয়াল ইত্যাদি স্থায়ী মাধ্যমে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও জলরঙ অনেক পাতলা হওয়ায় কাগজের মত অস্থায়ী মাধ্যমেই এই রঙ সবসময় ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু কাগজের উপর আকা কোন চিত্রকর্মই বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। যার কারণে জলরঙে  কোন মাস্টারপিস চিত্রকর্ম আমরা পাইনা। এই একটি বিষয়ের কারণেই শিল্পীরা জলরঙ থেকে তেলরঙ –এ বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

বর্তমানে তেলরঙ, জলরঙের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও রসায়ন বিজ্ঞানের কল্যানে এক্রামিন, অ্যাক্রেলিক, প্যাস্টেল, ড্রাই প্যাস্টেল ইত্যাদি অনেক প্রকার রঙ পাওয়া যায়। কিন্তু কোন রঙই এখনও তার ঐতিহ্য বা সূচনাকে ছেড়ে আসতে পারেনি। নতুন নতুন রাসায়নিক বস্তু ও নতুন নতুন খনিজ রঙের প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হলেও সব রঙই আসলে পিগমেন্টের উন্নত রূপ। রঞ্জন শিল্পের কাচামাল হিসেবে এখনো ব্যবহৃত হয়ে আসছে পিগমেন্ট। ব্যবহারিকতা বা চাকচিক্য অনেক উন্নতি হলেও রঙ্গনশিল্প বা রঙ এখনও আটকে আছে তার উৎপত্তিতেই।