বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্প

অন্য যে কোন শিল্পের তুলনাই ভাস্কর্য বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে বেশ বয়োজোষ্ঠ্য। কিন্তু বিশ্ব শিল্পকলার ইতিহাসের তুলনাই শিল্পকলার এই মাধ্যমে আমারা বেশ নবীন। সেই শিল্পকলার চলমান পথের গল্প তুলে এনেছেন সাজিদুল হক শুভ।

 বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের নমুনা পাওয়া যায় মূলত মৌর্য রাজাদের সময় থেকে। যদিও ইতিহাসবেত্তাদের মতামত ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুসারে অরো অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের ভাস্কর্য চর্চা হয়ে আসছে।কিন্তু ভঙ্গুর ও অস্থায়ী মাধ্যমের কারণে এর পূর্ববর্তী সময়কালের কোন ভাস্কর্যের নমুনা বাংলাদেশে পাওয়া যায়নি।

মূলত পলিমাটির তৈরি এই বৃহত্তর ব-দ্বীপে ভাস্কর্য, স্থাপনা বা কোন ধরণের ত্রিমাত্রিক শিল্পচর্চার জন্য নরম কাদামাটির কোন বিকল্পই তখন ছিলনা। মাঝে মাঝে কাঠের ব্যবহার হলেও, পাথর বা এমন কোন শক্ত স্থায়ী মাধ্যমের অভাবই ওই সব শিল্প নিদর্শন হারিয়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ বলে মনে করা হয়।

 উপমহাদেশের শিল্পকলার ইতিহাস বললে শুরুতেই চলে আসে সিন্ধু সভ্যতার কথা। ওই সময়কার শিল্পকলা ছিল মূলত সিল, মোহর এবং টেরাকোটা ফলক নির্ভর। অনেকদিন পর্যন্ত এগুলোই ছিলো শিল্পকলার মাধ্যম। যদিও আমাদের এই ভূখন্ডে এমনকোন নিদর্শনের উল্লেখ পাওয়া যায়না। সাম্প্রতি নরসিংদীতে প্রাপ্ত উয়ারী-বটেশ্বর পুরাকীর্তি সম্পূর্ণ উন্মোচিত হলে এর ইতিহাস কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। অন্যথায় বলা যায় বাংলাদেশে প্রাপ্ত সবথেকে প্রাচীনতম পূর্নাঙ্গ ভাস্কর্য নিদর্শণ হচ্ছে রাজশাহীর বাগমারায় প্রাপ্ত “বিষ্ণুর” ভাস্কর্যটি। যেটি ছাই রঙের বেলে পাথরে খোদাই করে তৈরি করা। যা গুপ্ত যুগের ভাস্কর্য নিদর্শন। যদিও চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর বিবরণীতে তিনি উল্লেখ করেছেন মৌর্য যুগেই এই বাংলার শিল্পকলার সব ধরনের চর্চার প্রচলন ছিল। তথাপি এ যাবৎকাল প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে মহাস্থান গড়ে একটি মৌর্য যুগীয় শিলালিপি, কিছু punch marked coin ছাড়া তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি।

প্রাচীন বাংলাদেশের ভাস্কর্যকে গুপ্ত যুগ, পালযুগ এবং সেন যুগের ভাস্কর্যে ভাগ করা হয়। গুপ্ত যুগের প্রাপ্ত সমস্ত ভাস্কর্যই কোন না কোন ভাবে ভগবান বিষ্ণুকে কেন্দ্র করে। দেবতা বিষ্ণুর যতগুলো ভাস্কর্য পাওয়া যায় তার প্রায় সবকয়টিতেই সোজা ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দৃশ্যমান। শুধু বাংলাদেশেরএই ভূ-খন্ডে নয় সমগ্র ভারতের সব জায়গায় এই সময়ে নির্মিত সকল বিষ্ণু ভাস্কর্যেই এই একই ভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। তবে গুপ্ত যুগের শুরুর দিকে ভাস্কর্য গুলোর ভঙ্গিমা নিয়ে যথেষ্ঠ মত বিরোধ রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ মনে করেন এই সময়ের ভাস্কর্যগুলো কুশান ও গুপ্ত যুগের মাঝামাঝি সময়ের নির্দেশক। গুপ্ত সময়কাল ছিলো ৩২০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ৫৫০খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত।পরবর্তী সময়ে যে ভাস্কর্য নমুনাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাহলো পাল সম্রাজ্যের সময়ের ভাস্কর্য। এই রাজত্ত্বের সময়কাল ছিলো ৭৫০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১১৭৪ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত । এ যুগের প্রায় ১ হাজারের বেশী ভাস্কর্য এখন পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়েছে। যার একটা বড় অংশ আবিস্কৃত হয়েছে সোমপুর বৌদ্ধ বিহারে। এ সময়ে বৌদ্ধ ভাস্কর্যের সাথে সাথে হিন্দু ভাস্কর্যেরও চর্চা হত। গুপ্ত সম্রাজ্যের সময়কার বা তার পূর্ববর্তী সময়ের প্রাপ্ত ভাস্কর্যে মাধ্যম হিসেবে মাটি, কাদা, পোড়া মাটি বা পরবর্তীতে বেলেপাথর ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পাল সম্রাজ্যে এসে ভাস্কর্যের মাধ্যম হিসেবে দুটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যমের প্রবেশ ঘটে। এর একটি হচ্ছে “কাল পাথর” এবং অপরটি হচ্ছে“ব্রোঞ্জ”। পাল সম্রাজ্যের সময়ে প্রাপ্ত ভাস্কর্যের চোখের স্থানে উত্তল একটি তলের দেখা পাওয়া গেলেও চোখের কর্ণিয়া বা কাল অংশের কোন নির্দেশ পাওয়া যায় না। যার ফলে এইসময়ের ভাস্কর্যগুলো অন্ধের মত দেখা যায়। বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারে কোন মূর্তি পুজারউল্লেখ না থাকলেও, হিন্দু ধর্মের আবেশে অনুপ্রাণিত হয়ে পূজার উদ্দেশ্যে পাল রাজারা বিভিন্ন ধরণের বৌদ্ধ ভাস্কর্যের নির্মান শুরু করে। এভাবে ধীরে ধীরে পাল রাজাদের হাত ধরে বৌদ্ধ ধর্মে মূর্তি পূজার আবির্ভাব ঘটে। এই পাল সম্রাজ্যের শেষের দিকে সেনদের আধিপত্য শুরু হয়। সেন বংশের সময়ে প্রাপ্ত ভাস্কর্যের অধিকাংশই ছিলো হিন্দু দেবতাদের ভাস্কর্য। এই সময়ের ভাস্কর্যের মধ্যে পাল সম্রাজ্যের ভাস্কর্যের সিলিন্ডার আকৃতির দেহকান্ডের হুবহু অনুকরন দেখা যায়। সেন বংশের ভাস্কর্য ছিলো মূলত পাল ভাস্কর্যেরই অনুকরণ। শুধুমাত্র বৌদ্ধ ভাস্কর্যের ভঙ্গিমা গুলোকে তারা হিন্দু ভাস্কর্যে নিয়ে আসে এবং তাদের ভাস্কর্যগুলোতে প্রচুর অলংকারের ব্যবহার দেখা যায়। সেন বংশের বিস্তৃতি ছিল ১০৯৭-১২২৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত। এই সময়কালের পরবর্তীতে বাংলাদেশের এই ভূ-খন্ডে ভাস্কর্য চর্চার তেমন নিদর্শন পাওয়া যায় না। এর  কারণ হিসেবে বলা যায় ভারতবর্ষে মুসলিম বাদশাহ বা সম্রাটদের শাষন। ইসলামিক দৃষ্টিকোন থেকে ভাস্কর্যের স্থান আচ্ছুত হওয়ায় ঐ সময়ের পর এই শিল্প বড় ধরণের বাধাপ্রাপ্ত হয়। ভাস্কর্য শিল্পের প্রসার না হলেও স্থাপত্যশিল্প ব্যপক উৎকর্ষ লাভ করে এই সময়। স্থাপত্য শিল্পের হাত ধরে পরস্পর সম্পূরক হিসেবে ভাস্কর্য শিল্প নতুন অবলম্বনে কিছুটা বিস্তার লাভ করে। হাই রিলিফ বা টেরাকোটার মাধ্যমে স্থাপত্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের নক্সাদার টেরাকোটা  ব্যবহৃত হত ব্যপক হারে। শুধু মুসলিম স্থাপত্য নয়। রিলিফ টেরাকোটা সবথেকে বেশী ব্যবহৃত হত হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম মন্দিরগুলোতে। কিছু কিছু মন্দির তো শুধুমাত্র টেরাকোটা করা ইট বা ফলক দিয়ে তৈরি করাহয়েছে। যেমন ১৭৫২ খ্রীষ্টাব্দে দিনাজপুরে তৈরি হওয়া কান্তজির মন্দির। পরবর্তীতে ব্রিটিসরা এ উপমহাদেশে আগমনের পর ভারতীয় মূল ভূ-খন্ডে প্রচুর ভাস্কর্য নির্মানকরলেও ধর্মীয় রাজনীতির প্রেক্ষিতে এই বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে ভাস্কর্য শিল্প ছিলঅনুপস্থিত। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে পূজার উদ্দেশ্যে নিয়মিতই ধর্মীয় মূর্তি নির্মান করত সেই সময়ে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যটা শুধুমাত্র ধর্মীয় হয়ায় সেগুলোর শিল্পমান বা স্থায়িত্ব নিয়ে কখনোই তারা সচেতন ছিলোনা। বরং কিছুক্ষেত্রে ঐতিহাসিকদের মতে সচেতন ভাবেই ওই সময়ে অস্থায়ী ধর্মীয় মূর্তী তৈরির প্রবনতা বেশী ছিল। এরপর পূর্ব পাকিস্থান থাকা অবস্থাই এই বাংলায় ভাস্কর্য নির্মান ছিল চূড়ান্ত রকম অসম্ভব। যার ফলে ভাস্কর্য শিল্প ১৩শ শতকের পর থেকে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত এই ভূ-খন্ডে প্রায় অনুপস্থিতই বলা যায়। স্বাধীনতার পরে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে নতুন ভাবে শুরু হয় বাংলাদেশের ভাস্কর্য চর্চা। যদিও ১৯৬৫ সালে নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য চর্চার প্রয়াসকে এই যুগের তথা আধুনিক বাংলাদেশী ভাস্কর্যের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু স্বাধীন বাংলায় প্রথম উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হচ্ছে আব্দুর রাজ্জাকের করা গাজীপুর চৌরাস্তার “জাগ্রতচৌরঙ্গী”। ১৯৭৩ সালে এই ভাস্কর্য তৈরির পর থেকেই বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্প নতুনধারায় মোড় নেয়। শুরু হয় নতুন ধারার ভাস্কর্য চর্চা। অপরাজেয় বাংলা, সাবাস বাংলাদেশ, অদম্য বাংলা, দূর্জয়, প্রত্যাশা, সোপার্জিত স্বাধীনতা ,চেতনা’৭১ ইত্যাদি অরো অনেক ভাস্কর্য সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে বিভিন্ন স্থানে অনেক গুলি ভাস্কর তৈরি করেছেন এই চেতনাতেই উদ্ভুদ্ধ হয়ে। এই সময়ে বাংলাদেশে ভাস্কর্যের সাথে সাথে ফোয়ারাও ত্রিমাত্রিক শিল্প মাধ্যম হিসেবে প্রকাশ পায়। যদিও অনেকে ফোয়ারাকে ঠিক ভাস্কর্য না বরং স্থাপত্য বলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তবুও তার গতি ভাস্কর্যের মত একই ধারায়। সার্ক ফোয়ারা, কদম ফোয়ারা, গুলিস্থান সার্কেল ফোয়ারা ইত্যদি বাংলাদেশের ফোয়ারার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। স্বধীনতার ভাস্কর্যের বাইরে অজিজুল জলিল পাশার করা শাপলা চত্বর এবং দোয়েল চত্বর নতুন ভাস্কর্য মাধ্যম নিয়ে আসে এদেশের ভাস্কর্যে। তারপরও ভাস্কর্যের উপাদানে কোন পরিবর্তন  আসছিল না অনেকদিন ধরেই। শিল্পি হামিদুজ্জামান খান ভাস্কর্যের মাধ্যম হিসেবে স্টীলের ব্যবহার করে নতুনত্ত্বের স্বাদ দেন আমাদেরকে।বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যের জনক বলা হয় তাকে। পরবর্তীতে মৃনাল হকের করা‘’বর্ষা রাণী’’, ’’ইস্পাতের কান্না’’ ইত্যাদি উৎকৃষ্ট আধুনিক ভাস্কর্যের নমুনা। যদিও আমাদের ভাস্কর্যের ইতিহাস অনেক পুরানো তবুও ঐতিহ্য অনুযায়ী  আমাদের ভাস্কর্য শিল্প ততবেশী সমৃদ্ধ না। নভেরা আহমেদ,  আব্দুর রাজ্জাক, নিতুন কুন্ডু, শামিম শিকদার, আজিজুল পাশা, হামিদুজ্জামান খান এমন আরো নামকরা বিখ্যাত সব ভাস্কররা থাকা সত্ত্বেও আমাদের এই ভাস্কর্য শিল্পের উন্নতি না হওইয়াটা বেশ বিস্ময়ের। ১৯৬৫ সালে নতুন করে শুরু হওয়া বাংলাদেশের ভাস্কর্যশিল্প কোননা কোন  ভাবে দাড়িয়ে আছে তার শুরুতেই। এখনও পর্যন্ত মাধ্যম হিসেবে মাটি, সিমেন্ট, ঢালায়, ফাইবার গ্লাস এবং স্টীল এর বাইরে নতুন কোন মাধ্যম বা বিষয় বস্তু এবং প্রচলিত ধ্যান-ধারনার বাইরে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। এটার জন্য বেশী দায়ী করা যায় আমাদের ভাস্কর্য চর্চার ধারাকে। যদিও আমাদের ভাস্কর্যের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু মাঝের ৮০০ বছরের বিরতি আমাদেরকে নিয়ে এসেছে একেবারে শুরুতে। তাই বলা যাই আমাদের ভাস্কর্য শিল্পের বয়স আদতে ৫০ বছর। যা কিনা সব থেকে নবীন তম। এ ছাড়াও আমাদের দেশে এই শিল্পের এমন রূগ্ন দশা হওয়ার আরেকটা কারন হল ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি। যদিও ভাস্কর্য চর্চার শুরুই হয়েছিল ধর্মীয় প্রেক্ষাপট থেকে, সেই ধর্মীয় কারনেই এই শিল্প আজ সব থেকে বেশী বাধাগ্রস্থ। মুসলিম আধ্যুসিত এই দেশের সাধারন মানুষ এখন পর্যন্ত ভাস্কর্যকে মুর্তি বা পৌত্তলিকতা থেকে আলাদা করতে পারেনি।ফলাফল এই শিল্পের গ্রহনযোগ্যতা সকলের কাছে খুবই কম। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকের অভাবে এ অবস্থার খুব বেশী উন্নতি এখনও  পর্যন্ত না হলেও বর্তমানে কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু ভাস্কর্য নির্মান হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এবং সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা আরো বৃদ্ধি পেলে হয়ত ভাস্কর্যশিল্প বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে আরো বেশী গর্বিত করে তুলতে সক্ষম হবে, ঠিক অতীতের ন্যায়।