নাগরিক আনন্দ বিষাদের দ্রষ্টা

স্বপ্নদ্রষ্টাদের মৃত্যু হয়না। তাদের জন্ম যুগান্তরে...তারা অতীত এবং ভবিষ্যতকে তুচ্ছ করে বেচে থাকে বর্তমানে...
তবুও আপনার অভাবে নীপবন আজ মরুভূমি...
তাই নীপবনের আহ্ববানে আপনার অপেক্ষায় আছি।
অপেক্ষায় আছি নতুন কোন হিমু বা শুভ্রের...
আপনার অপেক্ষায় ময়ূরাক্ষীর তীর...

সাজিদুল হক শুভঃ

 ছোটবেলা থেকেই জাদুবিদ্যা তাকে ভয়ানক আকর্ষণ করত। তাই হয়ত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চেষ্টার শেষ বিন্দু দিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন ম্যাজিশিয়ান হওয়ার চেষ্টায়। পৌছে গিয়েছিলে বিটিভির মঞ্চ পর্যন্ত। কিন্তু নিয়তি তার জাদুর ঝুড়ি সঞ্চিত রেখেছিলেন আরো বড়ো কোন মঞ্চের জন্য। তাই তো তিনি জুয়েল আইচ বা পি সি সরকারের মত মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষকে মুগ্ধ না করে বরং হয়ে গিয়েছেন তাদের স্বপ্ন দ্রষ্টা, জীবনের হাসি কান্নার অনুষঙ্গ।

সময়কে অতিক্রম করেছে বা কালোত্তীর্ণ হতে পেরেছেন এমন লেখকের সংখ্যা বাংলা ভাষায় নেহাত কম না। কিন্তু খুব সহজে মানুষের বসার ঘরে ঢুকে পড়তে পেরেছেন কতজন লেখক তা হিসাব করেত আঙ্গুলের কড়া গোনা লাগে না। বলা হয় একটি উন্নয়নশীল দেশের সব থেকে বড় সম্পদ তাদের যুব সমাজ। সেই যুব সমাজের একটি বড় অংশকে নিজের অসাধারণ লেখনি দিয়ে সল্প সম্ভাবনায় ও অল্প অনুষঙ্গে আনন্দময় জীবণযাপনের যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন শুধু মাত্র তার পক্ষেই সম্ভব নিজের মৃত্যুতে পুরা দেশকে এক করে কাদাতে। একজন মুজুরকে একদিন কাজ বন্ধ রেখে অনাহারে থেকে শোক পালন করাতে। তিনিই পারেন সরকারী ছুটি ছাড়াও একটি দিন কে শোক দিবস বানিয়ে ফেলতে।

তার ছোট বেলা নিয়ে সৃতিচারণ মূলক লেখা “আমার ছেলে বেলা” থেকে জানা যায় তার অদ্ভুত বাবা, বিচিত্র ছোটবেলা আর ভাইবোন পরিমন্ডিত উচ্ছ্বল শৈশবের কথা। আমরা জানি তার সংগ্রামী যৌবনের কথা। একাকী বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা আর জীবনঘাতি ব্যধির কথা। কিন্তু তিনি জানতেন আবেগ প্রবণ বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের প্রতিটি সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ণ আনন্দবেদনার গল্প , জানতেন ঢাকার রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন হেটে চলা বেকার যুবকের হাহাকার ,নিম্নবিত্তের বেচে থাকার উপলক্ষ্য। তাই তো আমরা “নন্দিত নরক” থেকে শুরু করে ক্রমাগত পেয়েছি একের পর এক বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের মহাকাব্য।

তার পূর্ববর্তী সময়ে উচ্চবিত্তের গল্প বলার অনেক লেখকই আমাদের চিত্তে বংশীয় দোলা দিয়েছে তাদের গল্প কথনে। রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে আমরা শুনেছি নিম্নবিত্তের আর্তদান। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন তৈরি হওয়া মধ্যবিত্তের সাহিত্য ভাষায় পরিচয় সংকট প্রকট হয়েছিল এই দুই শ্রেণীর প্রবলতায়। তিনি বাংলা সাহিত্যে বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের রূপদান করেছিলেন নিজের লেখনির মাধ্যমে । তাদের আবেগ-দুঃখ এবং বেচে থাকার সংগ্রামকে দিয়েছিলেন শিল্পরূপ। ছাপোষা জীবন চিত্রকে দিয়েছিলেন আনন্দময় যৌক্তিকতা। নাটক সিনেমায় দেখিয়েছিলেন তার রূপায়ন। আলাদা ভাবে নাটক ,সিনেমা বা সাহিত্যে তৈরি করেছিনেল হুমায়ূনী ভাষা।

 মানুষ হুমায়ূনের সানিধ্য আমরা খুব কমই পেয়েছি তার অন্তর্মুখী নিরহংকার জীবন যাপনের কারণে। তিনি যত উচ্ছ্বাসে নিজের আনন্দকে ভাগ করে নিয়েছেন সকলের সাথে, ততটাই নিশ্চুপ থেকেছেন বিষাদে। তাই তো কখনো তাকে মনে হয় হিমু  কখনো বা শুভ্র আবার কখনো মিছির আলী । কিন্তু আমাদের জীবনের প্রতিটি সূক্ষ্ণ অনুভূতি ছিল তার কাছে জীবন্ত। যার রূপায়ন তার উপন্যাসের চরিত্র। মানষ হুমায়ূন এবং ব্যক্তি হুমায়ূনের এই অলীক দূরত্বের কারণেই হয়ত তার তৈরি বাকের ভাই এর ফাঁসিতে পুরো বাংলাদেশ শোকাহত হয়ে অন্দোলনে জেগে ওঠে আর তার ব্যক্তি জীবনের নির্বাসনে মুখরোচক গল্পের উৎস খুজে পায়।

 

“হোটেল গ্রেভার ইন” গ্রন্থে ব্যক্তিগত গল্পের আবেগ প্রকাশের নিমিত্তে তিনি বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথের জন্ম না হলে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের আবেগের প্রকাশ ঘটানো অনেক কঠিন হয়ে যেত। আপনি কি জানেন বাংলা সাহিত্যে আপনার জন্ম না হলে মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর সাধারণ জীবনযাপনে  তৃপ্ত হওয়া কত কঠিন হয়ে যেত?