নব্য বঙ্গীয় আন্দোলন।

ভারতীয় শিল্পের নিজস্ব ধারা খুজে পেতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে বাঙ্গালী সহ বিভিন্ন জায়গার শিল্পীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে আমরা বাংলায় প্রাচ্যকলা রীতির সাথে পরিচিত হই। সেই নব্য বঙ্গীয় স্কুল নিয়েই আলোচনা করেছেন মোঃ সাজিদুল হক শুভ

জাতিগত ভাবে নানান সময় নানান ভাবে বাংলা শাসিত ও শোষিত হয়েছে বিভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন জাতি, ধর্মও দেশের মানুষের কাছে। তারা লুট করেছে বাংলার সম্পদ, বপন করেছে ভিন্নতা আর বদলে দিয়েছে সংস্কৃতির নিজস্বতা। তাই তো আমরা বালুচুরির মোটিফে ইওরোপিয়ান ফিগার বা রেলের ইঞ্জিন, হিন্দু দেবতারবা বুদ্ধের মুর্তিতে গ্রীক ভাস্কর্যের প্রভাব বা রাজা রবি ভার্মার পৌরানিক কাহিনী নিয়ে করা পেন্টিং দেব-দেবীর আদলে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি, রাফায়েল এর যিশুর আদল দেখে বিস্মিত হই না। কিন্তু ভারতে বাইরের মানুষের এই প্রভাব বিস্তার করার আগে সময়ে আলোকপাত করলে  আমরা দেখতে পায় অসাধারণ ও অনন্য সাধারণ সব একান্ত ভারতীয় শিল্পকর্ম। অজন্তা-ইলোরা, সিন্ধু সভ্যতা, জৈন মন্দির, কৈলাস মন্দির, ভারহুত স্তূপ এমন সব অনবদ্য শিল্পকলার জন্ম দেওয়া একটি সভ্যতার শিল্পকলাকে নিজস্বতা হারাতে দেখাটা কতখানি কষ্টের তার ই বোধ থেকে হয়ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারত শিল্পের একজন অনুরাগী ও প্রচারক ই বি হ্যাভেল এর সহযোগীতায় ও সমকালীন শিল্পীদের অংশ গ্রহনে শুরু করেছিলেন ভারতীয় শিল্পকলার এক নতুন গল্প।  যে আন্দোলন “বেঙ্গল স্কুল” বা “নব্যবঙ্গীয় শৈলী” হিসেবে পরিচিতি পায় পরবর্তীতে।

১৮৯৬ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন ই বি হ্যাভেল। ততদিনে দক্ষ শিল্প কারিগর তৈরির উদ্দেশ্যে ইংরেজদের মাধ্যমে বাংলাতে পশ্চিমা ধারায় শিল্পকলার প্রশিক্ষণ করানো শুরু কয়ে গেছে পুরো মাত্রাই। হয়ত ভারতীয় শিল্পকলার প্রতি অনুরাগী হ্যাভেলের কাছে যুক্তি যুক্তমনে হয়নি এই প্রক্রিয়া। আর তাই হয়ত তার হাত ধরেই অবনীন্দ্রনাথ ঠকুরের আভির্ভাব ঘটে দৃশ্যপটে। হ্যাভেলের অনুরোধে ১৯০৫ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর্ট স্কুলে অধ্যাক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যোগদানের পর তার এবং হ্যাভেলের যৌথ উদ্যোগে কলকাতা আর্ট কলেজে ভারতীয় ঐতিহাসিক শিল্পপদ্ধতিতে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই শিল্পশিক্ষা পদ্ধতি পরবর্তীতে তার নিজস্ব গন্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র ভারত ব্যাপি বিস্তারলাভ করে। স্বদেশী আবেগী পরিমন্ডলে এ শৈলী বিপুল জনপ্রিয়তা লাভকরে ও সমগ্র ভারত ছড়িয়ে পড়ে। “বেঙ্গল স্কুল” বা “ নব্যবঙ্গীয় শৈলী” হিসেবে পরিচিত এ শিল্পধারাই বস্তুত পক্ষে আধুনিক ভারতের প্রথম স্বীকৃত শিল্পশৈলী।

এই  নতুন আঙ্গিকে শিল্পধারা তৈরির কি প্রয়োজন হয়েছিল তখন?

ধারণা করা যায় যে বহু ধরণের সাংস্কৃতির চাপে ও পশ্চিমা শিল্পের সর্বগ্রাসী গতিকে থামিয়ে ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠিত শিল্পরীতিকে প্রচার করার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ। অপরপক্ষে ভারতীয় শিল্প নিয়ে পশ্চিমাদের যে অবজ্ঞার মনোভব তখন পরিলক্ষিত হত এটা তার একটি প্রতিবাদ ও বলা যেতে পারে। তৎকালে ভারতবর্ষ ব্যাপী কেরালার জনপ্রিয় শিল্পী রাজা রবি ভার্মার পাশ্চাত্যরীতির তেলরঙে আঁকা ভারতীয় ধর্মীয় ও পৌরাণিক বিষয়বস্তুর নাটকীয় উপস্থাপনে করা চিত্রকর্ম গুলোকেও হ্যাভেল ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুমোদন করেন নাই। তাদের সার্বাঙ্গিক প্রচেষ্টা ছিল ঐতিহ্যিক ভারতীয় শিল্পরীতিকে পুনঃপ্রবর্তন করা।

কিন্তু বস্তুতপক্ষে অবনীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত শৈলীটি কোন নিখাদ ভারতীয় শিল্পধারা ছিল না। এটি প্রকৃতপক্ষে অজন্তা, মুঘল, ইউরোপীয় বাস্তাবানুগতা ও জাপানি ওয়াশ-পদ্ধতির একটি সংশ্লেষিত রূপ। তাছাড়াও এর মধ্যে ভারতীয় লোক শিল্পের কোন কোন মাধ্যের প্রভাবও ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রধানত জলরঙে করা ভারতীয় ধর্ম,পুরাণ, ইতিহাস ও সাহিত্য আশ্রিত এই শিল্পকে নব্য ভারতের উপযোগী শিল্প হিসেবে জাতীয়তাবাদীরাও অভিনন্দিত করে। এই শিল্প ধারায় উদ্বুদ্ধ শিল্পীদের ধর্ম ও পুরানের পরিবর্তে ইতিহাস ও সাহিত্য আশ্রিত বিষয়ে বেশী পক্ষপাত তাদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে পরিলক্ষিত হয়।

সূচনা তার মাধ্যমে হলেও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একার পক্ষে এমন একটি পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ত যদি তিনি সঠিক সহযোগীতা না পেতেন সমকালীন অন্য শিল্পীদের কাছ থেকে। তার সাথে একাত্ততা প্রকাশ করে তাকে সার্বিক ভাবে এই শিল্পধারা প্রতিষ্ঠায় যারা তার সাথে সামিল হয়েছিল তারা হলেন-

১। নন্দলাল বসু (১৮৮৩ - ১৯৬৬)

২। সুরেন্দ্র নাথ কর (১৮৯৪ – ১৯৭০)

৩। অসিত কুমার হালদার (১৮৯০ – ১৯৬৪)

৪। কে ভেঙ্কটাপ্পা (১৮৮৭ – ১৯৬৫)

৫। সমরেন্দ্র নাথ গুপ্ত (১৮৮৭ – ১৯৬৪)

৬। ক্ষিতীন্দ্র নাথ মজুমদার (১৮৯১ – ১৯৭৫)

৭। শৈলেন্দ্র নাথ দে (১৮৯১ – ১৯৭২)

৮। এম এ আর চুঘতাই (১৮৯৪ – ১৯৭৫)

৯। যামীনি রায় (১৮৮৭ – ১৯৭২)

১০। মনিষী দে (১৯০৯ – ১৯৬৬)

১১। মুকুল দে (১৮৯৫ – ১৯৮৯)

১২। কালীপদ ঘোষাল (১৯০৬ – ১৯৯৫)

১৩। সুধীর খাস্তগীর (১৯০৭ – ১৯৭৪)

১৪। দেবী প্রসাদ রায়চৌধুরী (১৮৯৯ – ১৮৭৫)

১৫। বীরেশ্বর সেন (১৮৯৭ – ১৯৭৪)

১৬। গগেন্দ্র নাথ ঠাকুর (১৮৬৭ – ১৯৩৮)

১৭। রামকিংকর বেইজ (১৯০৬ – ১৯৮০) প্রমুখ।

ভারতমাতা- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভারতমাতা- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সীতার অগ্নি পরীক্ষা- নন্দলাল বোস

সীতার অগ্নি পরীক্ষা- নন্দলাল বোস

কলের বাঁশি- রামকিংকর বেইজ

কলের বাঁশি- রামকিংকর বেইজ