অপরাজেয় বাংলা

স্বাধীন বাংলায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে যে ভাস্কর্য গুলো স্বীকৃত অপরাজেয় বাংলা তার মধ্যে অন্যতম। এই ভাস্কর্যের নির্মানের পিছনের কিছু অজানা গল্প তুলে ধরেছেন মোঃ সাজিদুল হক শুভ।

স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ভাস্কর্য বানানোর চল বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল বেশ আগেই। হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদ ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে একটি অবয়ব ভাস্কর্য বা কাঠামোগত ভাস্কর্য নির্মাণের মাধ্যমে এ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ভাস্কর্য অপরাজেয় বাংলা  স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে অভিনব।

“কিছু স্থাপনা কে সরকার স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়, আর কিছু স্থাপনা মানুষের মাধ্যমে স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত হয়। আমারটা দ্বিতীয় পক্ষের।”

নিজের তৈরি ভাস্কর্য অপরাজেয় বাংলাকে এইভাবেই মূল্যায়ন করেন ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালেদ। ভাস্কর্যটি ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, কর্মজীবী সর্বোপরি আপামর বাংলাদেশের জনগনের কাছে আন্দোলনের ভাষা ও প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কলাভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এ  ভাস্কর্যটি আর শুধু ভাস্কর্য নেই, পরিণত হয়েছে মানুষের আবেগ, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ও আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলের মঞ্চে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট ইউনিয়িন  (ডি.ইউ.সি.এস) এবং প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলন একটি কাঠামোগত রূপক আকৃতি লাভ করে। ১৯৭৩ সালে প্রথম এই ভাস্কর্যের কাজ শুরু হয়। জানুয়ারি মাস হতে শুরু করে টানা তিন মাস কঠোর পরিশ্রম করে ভাস্কর্যটির ম্যাকেট বা মূল নকশা তৈরি করেন ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালেদ। ম্যাকেট তৈরির পরে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সেটি দেখেন এবং এর গঠনশৈলী,ভাব-গাম্ভীর্য ও নান্দনিকতা দেখে মুগ্ধ হন। মূল ভাস্কর্য তৈরিতে তৎকালীন প্রায় ৫০,০০০/- টাকা খরচ হবে জেনেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং অর্থ সংস্থাপনের আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে ডি.ইউ.সি.এস এই ভাস্কর্যের জন্য অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের অর্জিত স্বাধীনতাকে রূপকায়িত করার জন্য একটি স্বাধীনতার ভাস্কর্য তৈরি করতে যেয়ে ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালেদকে প্রকৃত অর্থে আরেকটি যুদ্ধ শুরু করতে হয়। কাজটির শুরু থেকেই কিছু মৌলবাদী সংগঠন ইসলামের দোহায় দিয়ে এর বিরোধীতা শুরু করে। তারপরও শ্ত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও ভাস্কর্য তৈরির কাজ এগিয়ে যেতে থাকে ধীরে ধীরে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নাগাদ এর কাজ অর্ধেক শেষ হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অনেকটা রাগে, দুঃক্ষে এবং কিছুটা অভিমান থেকে মেটাল কাস্টিং এর উপর ডিপ্লোমা করতে লন্ডনে চলে যান আব্দুল্লাহ খালেদ। ১৯৭৭ সালের শেষ দিকে তাকে জানানো হয় পুনরায় অপরাজেয় বাংলার নির্মাণ কাজ শুরু হবে। ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরে আবারও মৌলবাদীদের হুমকির মুখে পড়েন তিনি। শিল্পী আনোয়ার জাহানের একটি কাজ কাস্টিংশেষে স্থাপনের জন্য অপেক্ষমান ছিল। মৌলবাদীরা সেটি ভেঙ্গে ফেলে। হুমকি দেয় অর্ধসমাপ্ত অপাজেয় বাংলাও ভেঙ্গে ফেলবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে স্বাক্ষরতা কার্যক্রম চালান তিনি। মৌলবাদীর বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন গণ আন্দোলন, সেই সাথে চলতে থাকে অপরাজেয় বাংলার বাকি কাজ। এত প্রতিকূলতার মধ্যে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় অপরাজেয় বাংলার নির্মাণ কাজ। ১৬ ই ডিসেম্বর ১২ জন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতিতে উদ্বোধন করা হয় অপরাজেয় বাংলার। হুইল চেয়ারে বসা পঙ্গু  মুক্তিযোদ্ধাদের হাসিমাখা মুখগুলো যেন স্বাধীনতারপরবর্তী একটি বড় অর্জন হয়ে উঠেছিল সেই দিন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রকৃত অর্থে গর্বিত হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রকৃত বীরদের সামনে স্বাধীনতাকে সন্মান প্রদর্শন করতে পেরে।

বেজ সহ সাড়ে ১৭ ফুট উঁচু কক্রিটের তৈরি ভাস্কর্যটিতে খুব অল্প পরসরে কাজের মাধ্যমে শিল্পী স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙ্গালী নর-নারীর ভূমিকাকে পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনটি বলিষ্ঠ অবয়বের মধ্য দিয়ে সেবিকারূপী বাঙ্গালী নারীদের অবদান, কৃষকরূপী শ্রমজীবী সমাজের ভূমিকা এবং শিক্ষিত শ্রেণির বুদ্ধিদীপ্ত আন্দোলনকে রূপকায়িত করেছে এই ভাস্কর্যে। পেস্টিং ও কার্ভিং এর সমন্বয়ে করা এই ভাস্কর্যটির অবস্থানগত কারণেও এর সৌন্দর্যেযুক্ত হয় অন্য একটি মাত্রা।

একটু পেশীবহুলবলিষ্ঠ মানব অবয়ব গুলো মুক্তিযুদ্ধে বাঙ্গালীদের হার না মানা এবং শক্তিশালী মানসিকতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালেদের কাছে ভাস্কর্যটি সম্পর্কে আরো কিছু জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, “ ভাস্কর্যটি আমাদের রাজনৈতিক সচেনতার সমন্বিত প্রতীক, যা সাধারণ ছাত্রদের মাঝে দৃঢ় জাতিসত্ত্বের জন্ম দেয়”। এ ধরণের একটি ভাস্কর্য বানানোর ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনাগুলোই তার কাছে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল বলেই তিনি জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের সব থেকে বড় আন্দোলনের স্মৃতিস্তম্ভকে ঘিরে যখন ছোট ছোট আন্দোলনগুলো বিস্তার লাভ করে তখন অপরাজেয় বাংলাকে নিছক একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা ভাস্কর্য মনে না হয়ে মনে হয় ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কোন জীবন্ত কিংবদন্তী।